Friday, July 6, 2012

রোহিঙ্গা মুসলমানদের ইতিহাস এবং মিয়ানমারের আরাকানে মুসলিম নির্যাতনের অজানা কাহিনী


রোহিঙ্গা মুসলমানদের ইতিহাস এবং মিয়ানমারের আরাকানে মুসলিম নির্যাতনের অজানা কাহিনী
রোঁয়াই, রোহিঙ্গা এবং রোসাঙ্গ শব্দগুলো পরিমার্জিত হয়ে বাঙালি কবিদের কাছে রোসাঙ্গ হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের কাছে রোয়াং হিসেবে পরিচিত হয়েছে।
রোয়াং কিংবা রোসাঙ্গ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে বিশেষজ্ঞগণ নানা মত পোষণ করে থাকেন। কিছু ঐতিহাসিক মনে করে থাকেন,
আরাকানের পূর্বতন রাজধানী ম্রোহং শব্দটি বিকৃত হয়ে রোয়াং, রোহাংগ, রোসাংগ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। চট্টগ্রামীদের কাছে, এমনকি আরাকানের রোহিঙ্গাদের কাছে ম্রোহাং পাথুরী কিল্লা বলে পরিচিত।

১৪০৪ খ্রিস্টাব্দে নরমিখলা নামে আরাকানের জনৈক যুবরাজ মাত্র ২৪ বছর বয়সে পিতার সিংহাসনে আরোহণ করেন। রাজধানী ছিলো লেম্ব্রো নদীর তীরে লংগ্রেত। সিংহাসনে আরোহণ করেই নরমিখলা একজন দেশীয় সামন্তরাজার ভগ্নিকে অপহরণ করে রাজধানী লংগ্রেতে নিয়ে আসেন। ফলে আরাকানের সামন্তরাজাগণ একত্রিত হয়ে বার্মার রাজা মেঙশো আইকে আরাকান দখল করার জন্য অনুরোধ জানান। ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে বার্মার রাজা ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আরাকান আক্রমণ করলে নরমিখলা পালিয়ে তদানিন্তন বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসে আশ্রয় নেন। তখন ইলিয়াস শাহী রাজবংশ গৌড় থেকে বাংলা শাসন করতো।

জনশ্রুতি রয়েছে, নরমিখলা গৌড়ে এসে সুফী হযরত মুহম্মদ জাকির রহমতুল্লাহি আলাইহি নামক জনৈক বিখ্যাত কামিল ব্যক্তির দরবার শরীফ-এ আশ্রয় নেন।

নরমিখলা সুদীর্ঘ চব্বিশ বছরকাল গৌড়ে অবস্থান করেন এবং ইসলামের ইতিহাস, সভ্যতা ও রাজনীতি অধ্যয়ন করেন।
He turned away from what was Buddhist and familiar to what was Mohamedan.

চব্বিশ বছর পর ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সুলতান নাসিরউদ্দিন শাহ মতান্তরে জালালুদ্দিন শাহ সেনাপতি ওয়ালী খানের নেতৃত্বে বিশ হাজার সৈন্যবাহিনী দিয়ে নরমিখলাকে স্বীয় রাজ্য আরাকান উদ্ধারের জন্যে সাহায্য করেন।

উল্লেখ্য, নরমিখলা ইতোমধ্যে নিজের বৌদ্ধনাম বদলিয়ে মুহম্মদ সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেন। ফলে বার্মার ইতিহাসে তিনি মুহম্মদ সোলায়মান (মংস মোয়ান) হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। গৌড়ীয় সৈন্যের সহায়তায় নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহ আরাকান অধিকার করে ম্রাউক-উ নামক এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠান করেন। আর এ সাথে শুরু হয় বঙ্গোপসাগরে উপকূলে এক শ্রেষ্ঠ সভ্যতার।

In this way Arakan became definitly oriented towards the Moslem states, contact with a modern Civiliation resulted in renaissance. The Countrys great age began.
অর্থাৎ- এভাবে আরাকান নিশ্চিতভাবে মুসলিম রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে, একটি আধুনিক সভ্যতার সাথে এই সম্পর্ক আরাকানে এনে দেয় এক রেনেসাঁ। আরাকানী জাতির এক মহাযুগ শুরু হয়।

১৪৩০ খ্রিস্টাব্দে সেনাপতি ওয়ালী খানের নেতৃত্বে নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহ আরাকান অধিকার করার এক বছরের মধ্যে ওয়ালী খান বিদ্রোহ করে নিজেই আরাকান দখল করে নিলে পর গৌড়ের সুলতান জালালুদ্দিন শাহ সেনাপতি সিন্ধিখানের নেতৃত্বে আবার ত্রিশ হাজার সৈন্য পাঠিয়ে সোলায়মান শাহকে (নরমিখলা) সাহায্য করেন। সিন্ধি খানের নামে একটি মসজিদ এখনো ম্রোহং বা পাথুরী কিল্লাতে রয়েছে। অতঃপর সকল গৌড় থেকে আগত সৈন্যরা আরাকানেই বিশেষ রাজকীয় আনুকূল্যে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। ১৪৩২ খ্রিস্টাব্দে সিন্ধি খানের সহযোগিতায় সোলায়মান শাহ পিতার রাজধানী লংগ্রেত থেকে ম্রোহং নামক স্থানে স্বীয় প্রতিষ্ঠিত ম্রাউক-উ বংশের রাজধানী স্থানান্তরিত করেন। ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকান গৌড়ের সুলতানদের কর প্রদান করতো।
১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সুযোগে সোলায়মান শাহর দ্বাদশতম অধঃস্তন পুরুষ জেবুক শাহ (মিনবিন) ম্রোহং-এর সিংহাসনে আরোহণ করে পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা এবং এবং জেবুক শাহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় ম্রাউক-উ-সাম্রাজ্য।

With him (Zabukshah) the Arakanese graduated in their Moslem studies & the Empire was founded. উল্লেখ্য, ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত শেখের কিছু কাল বাদ দিলে আরাকান ম্রাউক-উ রাজবংশের শাসনাধীন ছিলো। এ সময়ে প্রায় প্রত্যেক রাজা নিজেদের বৌদ্ধ নামের সাথে একটি মুসলিম নাম ব্যবহার করেছেন। ফারসী সরকারি ভাষা হিসেবে চালু হয়। গৌড়ের মুসলমানদের অনুকরণে মুদ্রা প্রথার প্রবর্তন হয়। মুদ্রার একপিঠে রাজার মুসলিম নাম ও অভিষেক কাল এবং অপরপিঠে মুসলমানদের কালিমা শরীফ আরবী হরফে লেখা হয়।

রাজার সৈন্যবাহিনীতে অফিসার থেকে সৈনিক পর্যন্ত প্রায় সবাইকে মুসলমানদের মধ্য থেকে ভর্তি করানো হতো। মন্ত্রী পরিষদের অধিকাংশই মুসলমান ছিলো। কাজী নিয়োগ করে বিচারকার্য পরিচালিত হতো।

অপর এক রাজা সেলিম শাহ বার্মার মলমিন থেকে বাংলার সুন্দরবন পর্যন্ত বিরাট ভূভাগ দখল দিল্লির মোঘলদের অনুকরণে নিজেকে বাদশাহ উপাধিতে ভূষিত করেন। নিঃসন্দেহে তদানিন্তন শ্রেষ্ঠ সভ্যতা তথা মুসলিম আচার-আচরণ অনুকরণে এসে আরাকানের সমাজ জীবন পরিচালিত হয়েছে সুদীর্ঘ প্রায় চারশ
বছরকাল। যাকে রোসাঙ্গ সভ্যতা হিসেবে চিহ্নিত করা যেতে পারে।

এদিকে খ্রিস্টীয় ৮ম/৯ম শতাব্দীতে চন্দ্র বংশীয় রাজারা আরাকান শাসন করতো। উজালী ছিলো এ বংশের রাজধানী। বাংলা সাহিত্যে যা বৈশালী নামে খ্যাত। এ বংশের উপাখ্যান রাদ জা
তুয়েতে নিম্নরূপ একটি আখ্যান উল্লেখ আছে। কথিত আছে, এ বংশের রাজা মহত ইং চন্দ্রের রাজত্ব কালে (৭৮৮-৮১০ খ্রিস্টাব্দ) কয়েকটি বাণিজ্য বহর রামব্রী দ্বীপের তীরে এক সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে। জাহাজের আরবীয় আরোহীরা তীরে এসে ভিড়লে পর রাজা তাদের উন্নততর আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে আরাকানে বসতি স্থাপন করান। আরবীয় মুসলমানগণ স্থানীয় রমণীদের বিয়ে করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জনশ্রুতি আছে, আরবীয় মুসলমানেরা ভাসতে ভাসতে কূলে ভিড়লে পর রহম রহম ধ্বনি দিয়ে স্থানীয় জনগণের সাহায্য কামনা করতে থাকে।

বলাবাহুল্য,
রহম একটি আরবী শব্দ। যার অর্থ দয়া করা। কিন্তু জনগণ মনে করে এরা রহম জাতির লোক। রহম শব্দই বিকৃত হয়ে রোয়াং হয়েছে বলে রোহিঙ্গারা মনে করে থাকেন। সুপ্রসিদ্ধ আরব ভৌগোলিক সুলায়মান ৮৫১ খ্রিস্টাব্দে রচিত তার বিখ্যাত গ্রন্থ সিলসিলাত উত তাওয়ারীখ; নামক গ্রন্থে বঙ্গোপসাগরের তীরে রুহমী নামক একটি দেশের পরিচয় দিয়েছেন। যাকে আরাকানের সাথে সম্পর্কযুক্ত মনে করা যেতে পারে।

কক্সবাজারের টেকনাফ থানায় শাহপরীর দ্বীপ বলে একটি স্থান রয়েছে। টেকনাফের অদূরে আরাকানের মংডু শহরের সন্নিকটস্থ সুউচ্চ দুটি পাহারের চূড়ার একটির নাম হানিফার টংকী এবং পাশ্ববর্তী অপরটি কায়রা পরীর টংকী বলে খ্যাত। আরাকানে জনশ্রুতি আছে, ইসলামের চতুর্থ খলীফা হযরত আলী কাররামাল্লাহু ওয়াজহাহু আলাইহিস সালাম উনার ছেলে হযরত মুহম্মদ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি ইয়াজীদের সাথে দন্দ্ব হওয়ার কারণে আরাকানে আসেন এবং ইসলাম প্রচার করেন। কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনার পর ইতিহাসে হযরত মুহম্মদ হানিফা রহমতুল্লাহি আলাইহি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কিছু জানা যায়নি।
অপরদিকে বঙ্গোপসাগরীয় উপকূল হতে দক্ষিণপূর্ব এশিয়া পর্যন্ত তৎকালীন সময়ের পূর্ব হতেই আরব বণিকদের যোগাযোগ থাকার প্রমাণ ইতিহাসে ভূরি ভূরি রয়েছে।

কক্সবাজার জেলায় বসবাসকারী জনগণ সাধারণ নিজেদের আরব বংশোদ্ভূত বলে মনে করে থাকেন। এই এলাকার জনগণের ভাষায় ক্রিয়াপদের পূর্বে না সূচক শব্দ ব্যবহার আরবী ভাষার প্রভাবের ফল বলে পন্ডিতগণের ধারণা। কক্সবাজারের জনগণের ভাষায় প্রচার আরবী ও ফারসী শব্দ এবং মঘী শব্দের আধিক্য দেখা যায়। মঘী জরিপের অনুরূপ অত্র এলাকার জমির পরিমাণ দ্রোন, কানী ও গণ্ডা ইত্যাদি হিসেবে হয়ে থাকেন। অপরপক্ষে বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে গৌড়ীয় পরিমাপ অনুসারে বিঘা, কাঠা ও পাখি হিসেবে হয়ে থাকে।

নিঃসন্দেহে কক্সবাজারের জনগণের উপর এটি রোসাঙ্গ সভ্যতার প্রভাবের ফল। অনেক ডাক ও পর্তুগীজ শব্দও জনগণের ভাষায় পরিলক্ষিত হয়। আরো দেখা যায়, পর্তুগীজ নাম ফারনানডেজ বিকৃত হয়ে পরান মিয়া, ম্যানুয়েল বিকৃত হয়ে মনু মিয়া হয়েছে।

অনেক ডাচ পর্তুগীজ সন্তান ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলমান হয়েছে- এমন ঘটনা নিয়ে একটি গল্প ডাচ ইতিহাসে পাওয়া যায়। ঘটনাটি হলো- আরাকানের ম্রাউক-ই রাজবংশের রাজত্বকালে কোন বিদেশী ইচ্ছা করলে আরাকানী রমণীদের বিয়ে করতে পারতো। কিন্তু আরাকান থেকে চলে যাওয়ার সময় আরাকানী স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যেতে পারতো না।

This prohibition often constituted a serious hardship in individual cases and we find Europeans resorting to all sorts of expedients to smuggle their families out of the country. There were cases of wives being hidden in large martaban jars and Smuggled on board ship. The Pious Dutch Calvinists were also not a little worried because their children left in Arakan were brought up to be Muslims.

অর্থাৎ- আরাকানে অবস্থানরত ডাচগণের ফেলে যাওয়া সন্তান-সন্তুতি মুসলমান হয়ে যায় বিধায় চলে যাওয়ার সময় বড় বড় মটকায় স্ত্রী-পুত্রদের লুকিয়ে আরাকান থেকে নিয়ে যেত। এ ঘটনাটি নিঃসন্দেহে তদানিন্তন আরাকানের সামাজিক সাংস্কৃতিক অবস্থান কেমন ছিল তা জানতে আমাদের সাহায্য করে। অর্থাৎ ইসলামই ছিলো তৎকালীন আরাকানের সমাজ জীবনে মূল প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি। মহাকবি আলাওল পদ্মাবতী কাব্যে রোসাঙ্গের জনগোষ্ঠীর একটি পূর্ণাঙ্গ বিবরণ দিয়েছেন,
নানাদেশী নানা লোক শুনিয়া রোসাঙ্গ ভোগ আইসন্ত নৃপ ছায়াতলে। আরবী, মিশরী, সামী, তুর্কী, হাবসী ও রুমী, খোরসানী, উজবেগী সকল। লাহোরী, মুলতানী, সিন্ধি, কাশ্মীরী, দক্ষিণী, হিন্দি, কামরূপী আর বঙ্গদেশী। বহু শেখ, সৈয়দজাদা, মোগল, পাঠান যুদ্ধা রাজপুত হিন্দু নানাজাতি। (পদ্মাবতী : আলাওল)

সন্দেহের অবকাশ নেই যে, রোহিঙ্গারাই ইতিহাস প্রসিদ্ধ রোসাঙ্গ সভ্যতার ধারক বাহক। তবে এটুকু বলা চলে, নানা জাতির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে এই রোহিঙ্গা জাতি।
১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে বার্মার রাজা আরাকান দখল করে নিলে পর আরাকানের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মগরা পালিয়ে আসে। এটাই যুক্তিসঙ্গত যে, বৌদ্ধদের সাথে সাথে মুসলমানরাও লাঞ্ছিত হতে থাকে। কোন স্থানে দুর্যোগ আসলে উক্ত এলাকায় বসবাসকারী প্রত্যেক অনুরূপ অত্যাচারের শিকার হতে বাধ্য।

অতএব, মগদের সাথে সাথে মুসলমানরাও চলে আসে। তবে তফাৎ হলো মগেরা পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয় গভীর জঙ্গলে আর মুসলমানেরা সমুদ্র পথে হিজরত করে এসে আশ্রয় নেয় স্বধর্মীয় চট্টগ্রামের মুসলমানদের কাছে। আরাকান থেকে আগত মুসলমান স্থানীয় মুসলমানদের কাছে এক বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং এখান থেকেই শুরু হয় অতীতের রোয়াই ও চাড়িগ্রাই (চট্টগ্রামী) দুই জনগোষ্ঠীর বিবাদের ইতিহাস।

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, রোঁয়াই শব্দটি রোসাঙ্গ হতে অভিন্ন। একই এলাকায় বসবাসকারী অধিবাসীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন দুই ধরনের ভাষা হতে পারে না। যেমন একজন উখিয়া থানার বসবাসকারী লোককে একজন মহেশখালী থানায় বসবাসকারী লোক থেকে চেহারার কারণে পৃথক করে নেয়ার উপায় নেই। তবে একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে লোকটির পূর্বপুরুষ রোঁয়াই নাকি চাড়িগ্রাই (চট্টগ্রামী)।

আরো উল্লেখ করা যেতে পারে, বাঁশখালী থানার কোন লোককে রাউজান থানার কোন লোক থেকে চেহারার জন্যে আলাদা করে নেয়া যাবে না। কিন্তু বাঁশখালীর চট্টগ্রামী কোন পল্লীর লোককে রোঁয়াই পল্লীর লোক থেকে ভাষার কারণে আলাদা করে নেয়া যাবে।

রোহিঙ্গা মুসলমান : ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতি


রোহিঙ্গা মুসলমান : ভাগ্যবিড়ম্বিত জাতি
ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ ॥

বর্তমান বিশ্বের আলোচিত ও ভাগ্যবিড়ম্বিত একটি মুসলিম জনগোষ্ঠীর নাম রোহিঙ্গা। মূলত এরাই আরাকানের প্রথম বসতি স্থাপনকারী মূল ধারার সুন্নি আরব মুসলমান। আরাকান রাজ্যের মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারকবাহক হিসেবে রোহিঙ্গাদের ভূমিকাই ছিল প্রধান। এমনকি আরাকানের সমগ্র মুসলিম জনগোষ্ঠীর ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলমান রোহিঙ্গা নামে পরিচিত। কিন্তু মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলমানদের নৃতাত্ত্বিক অস্তিত্বকে অস্বীকার করে আরাকান অঞ্চল থেকে মুসলিম সংস্কৃতি ও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে স্মৃতিপট থেকে মুছে ফেলার সব আয়োজন শেষ করেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। তা ছাড়া আরাকানের মগ সম্প্রদায় রোহিঙ্গাদের আরাকানি জাতিগোষ্ঠীর অংশ হিসেবে পরিচয় দিতেও নারাজ। ফলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বর্তমানে নিজ দেশে নাগরিকত্বহীন অবস্থায় পরবাসী হয়ে জীবনযাপন করছে। অথচ তাদের কেউ হাজার বছর, কেউ পাঁচ শতাধিক বছর আর কেউ বা কয়েক শ
বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে।
অতি সম্প্রতি জাতিগত শুদ্ধি অভিযানের নামে আবারো সেখানে মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। স্থানীয় মগ জনগোষ্ঠী এবং প্রশাসনের প্রকাশ্য সহায়তায় আরাকানের মংডু এবং আকিয়াব এলাকায় চলছে নির্বিচারে গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ। রোহিঙ্গাদের হাজার হাজার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে বিরানভূমিতে পরিণত করছে গ্রামের পর গ্রাম। রোহিঙ্গা তরুণী নারীদের অপহরণ করা হচ্ছে নির্দ্বিধায়। ইতোমধ্যে প্রায় পাঁচ হাজারের অধিক তরুণী নারীকে অপহরণ করা হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ। খাল, বিল ও জঙ্গলাকীর্ণ এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মহিলাদের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। ধর্ষণ শেষে নির্মমভাবে তাদের হত্যা করা হচ্ছে। মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে সেখানে। মানবিক বিপর্যয়ের এক জ্বলন্ত এলাকায় পরিণত হয়েছে রোহিঙ্গাদের বসতভিটে। এমন নির্মমতায় প্রাণ হারাচ্ছে অসহায় নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ সেখানকার খেটেখাওয়া অশিতি, অর্ধশিতিসহ সমগ্র রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী। সর্বস্ব হারিয়ে নিজেদের প্রাণটুকু বাঁচানোর তাগিদে তারা পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশে। কিন্তু বাংলাদেশ তাদের আশ্রয় দিতে সম কি না কিংবা আশ্রয় দিলেই এ সমস্যার সমাধান হবে কি না এসব বিতর্কের কারণে বাংলাদেশ সরকারও ভীষণভাবে কঠোরতা অবলস্বন করে তাদের আশ্রয়ের কোনো সুযোগ দিচ্ছে না। এমনকি আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দৃঢ়চেতা ভাষণ তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরো বেশি আতঙ্কিত করেছে বলে অনেকে মনে করছেন। ফলে আহত ও নির্যাতিত অসহায় মানুষগুলোকে অবর্ণনীয় কষ্টের মাধ্যমে নদী আর সাগরজলেই মৃত্যুমুখে গমন করতে হচ্ছে। বিশ্বায়ন, তথ্যপ্রযুক্তি ও মানবিক উৎকর্ষের এ উন্নত যুগে সবার চোখের সামনে এমন মানবিক বপর্যয় ঘটে যাচ্ছে নির্বিঘœভাবে। কেউ যেন নেই দেখার, সাহায্যের হাত বাড়ানোর কিংবা ন্যূনতম সহানুভূতি প্রকাশ করার। চোখের সামনে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে রাখাইন রাজ্য নামে পরিচিত আরাকান রাজ্যের ঐতিহ্যবাহী একটি মুসলিম জনগোষ্ঠী।
রোহিঙ্গা সঙ্কটের প্রোপট
আরাকান এককালে স্বাধীন রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত থাকলেও অধুনা মিয়ানমারের একটি প্রদেশ। অনুরূপভাবে রোহিঙ্গারাও এক সময় স্বাধীন আরাকানের অমাত্যসভা থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত থেকে নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখলেও বর্তমানে তারা আরাকানের সবচেয়ে নিগৃহীত জাতিগোষ্ঠী। ১৭৮৪ সালে বর্মিরাজ বোধপায়ার আরাকান দখলের মধ্য দিয়েই মূলত রোহিঙ্গাদের নিগৃহীত জীবনের সূচনা হয়। অতঃপর ব্রিটিশ শাসনের সমাপ্তিলগ্নে ব্রিটিশ কূটকৌশলের ফলে তাদের জীবনে দ্বিতীয়বারের মতো অনিশ্চয়তা নেমে আসে। স্বাধীনতা-উত্তর বার্মায় ১৯৬২ সালে সামরিক জান্তা নে উইন কর্তৃক মতা দখলের পর থেকে রোহিঙ্গারা ক্রমশ নাগরিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হতে থাকে। অবশেষে ১৯৮২ সালে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনের নামে তাদের বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে কল্লা বা বিদেশী আখ্যা দিয়ে দেশ থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করে। রোহিঙ্গারা জন্মসূত্রে আরাকানের নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের জীবনে এ দুর্ভোগের পেছনে নিম্নোক্ত কারণ উল্লেখ করা যায়Ñ
প্রথমত, রোহিঙ্গারা দীর্ঘ হাজার বছরের পথপরিক্রমায় আরাকানের অমাত্যসভাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে সমাসীন থাকলেও তারা নেতৃত্বের েেত্র স্বতন্ত্র কোনো ধারা সৃষ্টি করতে পারেনি। এমন পরিস্থিতিতে বর্মিরাজ বোধপায়া কর্তৃক ১৭৮৪ খ্রিষ্টাব্দে আরাকান দখলের পর আরাকানের সর্বময় মতা বর্মিদের হাতে চলে যায়। এরা পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গাসহ আরাকানি নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের হত্যা করে। অবশিষ্টদের অনেকেই প্রাণভয়ে বাংলায় পালিয়ে আসে এবং ১৮২৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-বর্মি যুদ্ধের মাধ্যমে আরাকান দখল পর্যন্ত এ দীর্ঘ সময়ে দেশের বাইরে অবস্থান করে। এ সময়ে সিন পিয়ানসহ অনেক আরাকানি নেতা স্বদেশ পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম পরিচালনা করলেও বিভিন্ন কারণে তারা ব্যর্থ হয়। ফলে বাংলায় আশ্রিত রোহিঙ্গাসহ আরাকানে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা নেতৃত্বের দিক থেকে আরো পিছিয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, ১৮২৬ সালে আরাকানে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হলে তারা রোহিঙ্গাদের বাহ্যিক কিছু সুযোগ-সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে নিজেদের মতার ভিত্তি মজবুত করে। শাসকগোষ্ঠী নিজেদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রয়োজনেই আরাকানের প্রশাসনের বিভিন্ন ত্রে ছাড়াও কৃষি, ব্যবসায় প্রভৃতি কাজের জন্য বাংলায় আশ্রিত রোহিঙ্গাসহ আরাকানিদের স্বদেশে বসবাসের সুযোগ দেয়। এ সময় রোহিঙ্গাদের নেতৃস্থানীয় শিতি শ্রেণীর অনেকেই আরাকানে ফিরে না গিয়ে বাংলার কক্সবাজার ও বান্দরবান অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত শ্রেণীসহ কিছু নেতৃস্থানীয় রোহিঙ্গা স্বদেশে ফিরে গেলেও নেতৃত্বের েেত্র নতুন করে কোনো অবস্থান সৃষ্টি করতে সম হয়নি। পান্তরে ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানেরা ব্রিটিশের কর্তৃত্বকে সহজে মেনে না নেয়ার কারণে বরাবরই তারা মুসলমানদের শক্র মনে করত। ফলে বার্মায় পুরোপুরিভাবে ব্রিটিশ কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর রোহিঙ্গারা যাতে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে না পারে, সে জন্য তাদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত না করে স্থানীয় মগদের প্রাধান্য দিয়ে থাকে। এমনকি ব্রিটিশ কর্তৃপ বার্মাকে স্বাধীনতা দেয়ার আগে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বিষয়ে মগদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে। স্বাধীনতা-উত্তর মিয়ানমারের মতাসীন বর্মি ও স্থানীয় মগরা সে ইস্যুকে ক্রমেই শক্তিশালী করে তোলে; যার সর্বশেষ পরিণতি হিসেবে রোহিঙ্গারা কল্লা বা ভিনদেশী চিহ্নিত হয়ে স্বদেশ থেকে বিতাড়িত হয়। ব্রিটিশশাসিত বার্মাকে মুক্ত করার আন্দোলনে রোহিঙ্গারা স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা অং সানকে সমর্থন দিয়ে বার্মাকে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত করলেও তারা তাদের অধিকার ফিরে পায়নি। স্বাধীনতা-উত্তর বার্মার শাসকগোষ্ঠী বিভিন্ন অজুহাতে তাদের মিয়ানমার বা আরাকানের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ না করে শুধু আরাকানের বাসিন্দা হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকে।
রোহিঙ্গারা আরাকানের স্বাধিকার আন্দোলন শুরু করলে রাজনৈতিক কৌশলে তাদের এ পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয়। অতঃপর তাদের ওপর চালানো হয় ইতিহাসের বর্বরতম গণহত্যা। এ প্রোপটে ১৯৭৮-৭৯ সালে প্রায় তিন লাখ রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর চাপ ও বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কূটনৈতিক তৎপরতায় বিষয়টির বাহ্যিক সমাধান নিশ্চিত হয়। তাই রোহিঙ্গাদের নিঃশেষ করে দেয়ার জন্য কৌশল অবলম্বন করে ১৯৮২ সালে বিতর্কিত বর্ণবাদী নাগরিকত্ব আইন ঘোষণা করেন। এ আইনে নাগরিকদের Citizen, Associate Ges Naturalized শ্রেণীতে ভাগ করে ১৮২৩ সালের পরে আগত বলে Associate কিংবা ১৯৮২ সালে নতুনভাবে দরখাস্ত করে Naturalized Citizen ঘোষণা করার ব্যবস্থা করে। ওই আইনের ৪ নম্বর প্রভিশনে আরো শর্ত দেয়া হয়, কোনো জাতিগোষ্ঠী রাষ্ট্রের নাগরিক কি না তা নির্ধারণ করবে আইন-আদালত নয়; সরকারের নীতিনির্ধারণী সংস্থা Council of State, এ আইনের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রোহিঙ্গাদের কাছে কালো আইন হিসেবে বিবেচিত এ আইন তাদের সহায়-সম্পত্তি অর্জন, ব্যবসায়-বাণিজ্য, প্রতিরা সার্ভিসে যোগদান, নির্বাচনে অংশ নেয়া কিংবা সভা-সমিতির অধিকারসহ সার্বিক নাগরিক অধিকার কেড়ে নেয়। বাংলাদেশ সরকার ও বাংলাদেশের পত্রপত্রিকাসহ প্রচারমাধ্যমগুলো তাদের সেখানকার স্থায়ী নাগরিক হিসেবে সম্বোধন করে।
১৯৭৮ এবং ১৯৯১ সালে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে মিয়ানমার সরকার বিভিন্ন অপারেশনের নামে আরাকানে এক অমানবিক নির্যাতন চালায়। এ অপারেশনে তারা হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে নির্মমভাবে হত্যা করে এবং দুই পর্বে প্রায় পাঁচ লাধিক রোহিঙ্গাকে তাদের পৈতৃক বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদের মাধ্যমে প্রতিবেশী বাংলাদেশে তাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশ সরকার সীমিত সামর্থ্য নিয়েই অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে ত্রাণকার্যক্রমসহ আশ্রয়ণ ক্যাম্প তৈরি করে আন্তর্জাতিক সাহায্য-সহযোগিতায় বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করে। তথাপিও রোগ-শোক, অনাহার-অর্ধাহারে নাফ নদী পেরিয়ে আসা অসংখ্য লোক প্রাণ হারায়; যাদের মধ্যে অধিকাংশই নারী, শিশু ও বৃদ্ধ। বাংলাদেশ সরকার রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া ও কৌশল অবলম্বন করে দ্বিপীয় ভিত্তিতে এ সমস্যার সমাধান করেন।
জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে কাজ করলেও রোহিঙ্গাদের েেত্র শুধু শরণার্থীদের অস্থায়ী পুনর্বাসন, ভরণপোষণ তথা শরণার্থী জীবনযাপনে সার্বিক সহযোগিতা করছে কিন্তু নাগরিক অধিকার দেয়ার েেত্র তেমন কোনো ভূমিকা পালন করছে না। তা ছাড়া মিয়ানমারের মিলিটারি শাসকেরা বিশ্ব মতামতের খুব একটা ধার ধারে বলে মনে হয় না। সে দেশের বিরোধী নেত্রী, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অংসান সুচি দীর্ঘদিন যাবৎ বন্দী অবস্থায় জীবনযাপন করেছেন।
যেহেতু রোহিঙ্গা সমস্যার জন্য তিগ্রস্ত হয় বাংলাদেশ। তাই রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য বাংলাদেশকেই উদ্যোগ নিতে হবে। আরাকানি মুসলমানদের সাথে বাংলাদেশের সহস্র বছরের বন্ধন ও ঐতিহ্যকে সামনে রেখে ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, পারিবারিক ও ধর্মীয়সহ বহুমাত্রিক বন্ধনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে দেশের স্বার্থে; মানবতার জন্য বাংলাদেশের এগিয়ে আসা উচিত। রোহিঙ্গা সমস্যাকে জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে গুরুত্বসহকারে তুলে ধরতে হবে; এ েেত্র বিশ্বের মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে সমস্যা সমাধানের জন্য উৎসাহিত করে ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক মুসলিম সংস্থাগুলো মিলে জাতিসঙ্ঘের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যদি মানবাধিকারের মমত্ববোধ নিয়ে এগিয়ে এসে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করার দৃঢ় পদপে গ্রহণ করে তবেই কিছুটা আশার আলো দেখা যাবে। সেই সাথে বাংলাদেশকেও মিয়ানমার সরকারের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টায় আরো আন্তরিক হওয়া উচিত।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান কাম্য
পার্শ্ববর্তী আরাকান রাজ্যের বাঙ্গালী মুসলিম ভাই-বোনেরা আবারও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। মিয়ানমারের সরকারী ও বিরোধী দলীয় রাখাইন মগ দস্যুরা এবং নাসাকা পুলিশ বাহিনী সম্মিলিতভাবে পোড়ামাটি নীতি অনুসরণ করে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করেছে গত ৮ই জুন শুক্রবার থেকে। যুলুম ও অত্যাচারের এমন কোন দিক নেই, যা এই নরপশুরা চালিয়ে যাচ্ছে না নিরীহ মযলূম মুসলমানদের উপরে। ফলে ১৯৪২, ১৯৭৮ ও ১৯৯২-য়ের মত ২০১২-তে এসে তারা আবারও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হল। বিগত দিনেও তারা প্রতিবেশী বাংলাদেশ-এর টেকনাফ অঞ্চলে আশ্রয়ের জন্য ছুটে এসেছে। এবারও স্বাভাবিকভাবে তারা এদেশমুখী হয়েছে। সর্বস্বহারা মানুষগুলো যখন বাঁচার আশায় নৌকায় ভেসে পরিবার নিয়ে বাংলাদেশী দ্বীপগুলোর দিকে ছুটছে, তখন বর্বর বর্মী সেনাবাহিনী তাদেরকে নৌকাসহ ডুবিয়ে মারছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের আধা সামরিক বাহিনী বিজিবি তাদেরকে ফিরিয়ে দিচ্ছে পুনরায় বধ্যভূমি আরাকানের দিকে। ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত মানুষগুলি এভাবেই সাগরে ভেসে বেড়াচ্ছে অথবা ডুবে মরছে। সভ্য সমাজে এদৃশ্য কল্পনাতীত। বিগত দিনে বাংলাদেশ কখনো তাদের তাড়িয়ে দেয়নি। বরং আশ্রয় দিয়েছে নিঃসন্দেহে মানবিক কারণে। কিন্তু এবার এ নিয়মের ব্যতিক্রম হল। তাই বলতে হয়, অসহায় ডুবন্ত মানুষকে বাঁচানোই প্রথম কাজ, না তাকে নিয়ে রাজনীতি করাই প্রথম কাজ? পৃথিবীর সকল দেশ প্রতিবেশী দেশের নির্যাতিত আশ্রয়প্রার্থীদের আশ্রয় দিয়ে থাকে। আমাদের জনগণও বিগত দিনে ভারতে এবং বর্তমান সময়ে ইরাক, লিবিয়া ও অন্যান্য হাঙ্গামাপূর্ণ দেশ থেকে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে আশ্রয় নিয়েছে। অথচ আজ আমরা নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিয়ে যে অমানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করলাম, তাতে আমাদের বিপদের সময় কেউ আশ্রয় দেবে কি-না সন্দেহ।

একটি বাম জাতীয় দৈনিকের কলামিষ্টের ভাষায়
সংসদে পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপুমণি রোহিঙ্গা আন্দোলনের পিছনে জামায়াতে ইসলামীর উসকানি খুঁজে পেলেও ভাসমান মানুষের চোখের পানি দেখতে পাননি। কথাটা অতীব সত্য। মিয়ানমারের যালেম সরকার ও শান্তিতে নোবেলজয়ী গণতন্ত্রী নেত্রী অং সান সুচি মযলূম রোহিঙ্গাদের প্রতি যে নিষ্ঠুর আচরণ করেছেন, তাদেরকে যে ভাষায় তারা কটূক্তি ও অপদস্থ করে চলেছেন, আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রায় একই ভাষায় তাদের প্রতি তীর্যক মন্তব্য করেছেন। কথিত গণতন্ত্রী নেত্রী নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যা অং সান সুচির প্রতি সাংবাদিকদের প্রশ্ন ছিল, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে করণীয় কি বলে আপনি মনে করেন? হাস্যোজ্জ্বল সুচি তখন বলে ওঠেন, রোহিঙ্গা! তারা আবার কারা? তিনি এখন এদেরকে Kala অর্থাৎ বিদেশী বলছেন। সুচির দল এন,এল,ডি-র এক এম,পি গত এপ্রিলে তার সশস্ত্র ক্যাডারদের প্রথম রোহিঙ্গাদের উপর লেলিয়ে দিয়ে দাঙ্গা বাঁধান। আর তখন থেকেই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম সমূহ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে উত্তেজনা ছড়াতে শুরু করে। অতঃপর ৮ই জুন থেকে সুপরিকল্পিত ভাবে হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়। অথচ সুচি হয়ত ভুলে গেছেন যে, তার পিতা অন সানের অন্যতম প্রধান সহযোগী রাজনীতিক ছিলেন মুসলমানদের নেতা উ, রাযাক। শিক্ষা ও পরিকল্পনামন্ত্রী হিসাবে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিম ও বৌদ্ধ বার্মিজ সকলের নিকটে সমান জনপ্রিয় ছিলেন। পরবর্তীতে রাজনৈতিক সহিংসতায় সুচির পিতার সাথে তিনিও নিহত হন। অথচ আজ সুচি তার পিতার বন্ধুকে চিনেন না। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যখন রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চলছে, শান্তির মেডেলধারী সুচি তখন ইউরোপ ভ্রমণে বের হয়েছেন। উচিত ছিল তার সব ফেলে ছুটে যাওয়া নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের পাশে। হয়তবা তাতেই অবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটে যেত।

তাদেরকে
অপরাধপ্রবণ জাতি বলে কাঁটা ঘায়ে নূনের ছিটা দেওয়া হচ্ছে। অথচ ২০ লক্ষ মুসলিম অধ্যুষিত একটা জাতিকে ঢালাওভাবে অপরাধপ্রবণ বলা যে কত বড় অপরাধ তা যে কেউ বুঝতে পারেন। বরং বর্মী জলদস্যুদের হামলায় এক সময়ে পর্যুদস্ত বাংলাদেশে আজও বর্গী হামলা মগের মুল্লুক বলে প্রবাদবাক্য চালু আছে। সে সময়ের লুটপাটকারী এইসব বর্মী দস্যুরা তাদের স্বভাবধর্ম অনুযায়ী আজও রাখাইন নামে আরাকানী মুসলমানদের উপর সশস্ত্র দস্যুবৃত্তি চালিয়ে যাচ্ছে। রখ-ইঙ্গ অর্থ রাক্ষস ভূমি। হ্যাঁ, এ নামে পরিচিত হতে তারা আদৌ লজ্জাবোধ করে না। কারণ আসলে তারা রাক্ষসই বটে। এইসব নর রাক্ষসদের খোরাক হল শান্তিপ্রিয় মুসলিম বাঙ্গালী রোহিঙ্গা জাতি। বিগত পঞ্চাশের দশকে বার্মার সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে ১৮০টির বেশী স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সকলে অস্ত্র হাতে নিলেও রোহিঙ্গারা তা করেনি। বরং তাদের নেতা উ, রাযাক সুচির পিতা অং সানের সাথে মিলে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংগ্রাম করেছিলেন এবং তাতে তিনি অং সানের সাথে নিহত হয়েছিলেন।

অপরাধপ্রবণতা মানুষের স্বভাবজাত। যখন সে অপরাধ করে, তখন সে দায়ী হয়। কিন্তু কেউ অপরাধ করলে পুরা জাতিকে অপরাধী বলা যায় না। সম্প্রতি সঊদী আরবে ৮ জন বাংলাদেশীর এবং দুবাইয়ে দু
জন বাংলাদেশীর শিরোশ্ছেদ করা হয়েছে খুনের মত কঠিন অপরাধের কারণে। তাই বলে কি বাংলাদেশীরা সবাই খুনী? এর পরেও রোহিঙ্গারা সেদেশে যে নাগরিকত্বহীন মানবেতর জীবন যাপন করছে এবং আমাদের দেশে তাদের যারা শরণার্থী শিবিরে আছে, তারা কি স্বাভাবিক মানবাধিকার ভোগ করতে পারছে? তাই জীবনের তাকীদে তাদের কেউ যদি কোন অপরাধ করেই বসে, তাই বলে তাদের পুরা জাতিকে অপরাধপ্রবণ বলে অভিহিত করা কারু জন্যই সমীচীন নয়। সবচেয়ে বড় কথা এদেশী যেসব পাপিষ্ঠ তাদেরকে নানা অপকর্মে বাধ্য ও প্ররোচিত করছে, সরকার তাদের কি বলে আখ্যায়িত করবে?

রোহিঙ্গাদের ইতিহাস :
রোহিঙ্গারা আরাকান রাজ্যের আদি বাসিন্দা। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে আরবে যখন থেকে ইসলামের আবির্ভাব হয়, তখন থেকে চট্টগ্রামের ন্যায় এখানেও ইসলামের বিস্তৃতি ঘটে আরব বণিক ও মুহাদ্দিছ ওলামায়ে দ্বীনের মাধ্যমে (থিসিস পৃঃ ৪০৩)। অনেকে সূফীদের কথা বলেন। কিন্তু এটা ভুল। কেননা ইসলামের প্রাথমিক ও স্বর্ণযুগে কথিত সূফীবাদের কোন অস্তিত্ব ছিল না। ৭৮৮ খ্রিষ্টাব্দের বহু পরে তিব্বত হয়ে মিয়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মের প্রবেশ ঘটে। অতঃপর আরাকান হ
ল টেকনাফের পূর্বে উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ১০০ মাইল দীর্ঘ নাফ নদীর পূর্ব পাড়ে ৭২ মাইল দীর্ঘ দুর্লংঘ্য ও সুউচ্চ ইয়োমা (Yoma) পর্বতমালা বেষ্টিত বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী প্রায় ১৫ হাযার বর্গমাইল ব্যাপী একটি সমতল ভূমি। এটাকে প্রাচীন রাহমী (رهمي ) রাজ্যভুক্ত এলাকা বলে ধারণা করা হয়। যাকে এখন রামু বলা হয়। তৎকালীন রাহমী রাজা রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর জন্য এক কলস আদা উপঢৌকন হিসাবে পাঠিয়েছিলেন। যা তিনি ছাহাবীগণকে বণ্টন করে দেন (থিসিস, পৃঃ ৪২৫)। এতে ধরে নেওয়া যায় যে, তখন থেকেই এখানে ইসলাম প্রচারিত হয়েছে এবং স্থানীয় রাজাসহ সাধারণ অধিবাসীরা ইসলামকে সাদরে বরণ করেছে। জাহায ডুবির কারণেও বহু আরব এখানে এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিয়ে-শাদী করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। ইসলাম আগমনের বহু পরে ভারত থেকে ব্রাহ্মণদের অত্যাচারে বিতাড়িত হয়ে বৌদ্ধরা তাদের আদি বাসভূমি ভারত ছেড়ে থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, তিব্বত, মিয়ানমার, চীন, জাপান, কোরিয়া, ভিয়েতনাম প্রভৃতি দেশে অভিবাসী হয়। ভারত এখন প্রায় বৌদ্ধশূন্য বলা চলে। অথচ মুসলিম প্রধান বাংলাদেশে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টানরা শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। মধ্যযুগে আরাকানের রাজধানীর নাম ছিল ম্রোহাং। সেটারই অপভ্রংশ হল রোহাং বা রোসাঙ্গ এবং সেখানকার অধিবাসীরা হল রোহিঙ্গা। ১৪৩০ থেকে ১৭৮৫ খৃঃ পর্যন্ত সাড়ে তিনশ বছরের অধিক সময় আরাকানের রাজধানী ছিল রোসাঙ্গ। এখানকার মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশী মুসলমান। আর মুসলিমদের শতকরা ৯২ জন হল রোহিঙ্গা। ১৪৩৪ থেকে ১৬৪৫ খৃঃ পর্যন্ত দুশো বছরের অধিক কাল যাবৎ কলিমা শাহ, সুলতান শাহ, সিকান্দার শাহ, সলীম শাহ, হুসায়েন শাহ প্রমুখ ১৭ জন রাজা স্বাধীন আরাকান রাজ্য শাসন করেন। তাদের মুদ্রার এক পিঠে কালেমা ত্বাইয়িবা ও অন্য পিঠে রাজার নাম ও সাল ফারসীতে লেখা থাকত। তাদের পৃষ্ঠপোষকতায় তখন বাংলা ভাষার চরমোন্নতি সাধিত হয়। কবি আলাওল, দৌলত কাযী, মরদান শাহ প্রমুখ কবিগণ আরাকান রাজসভা অলংকৃত করেন। আজকে যেমন বাংলা ভাষার রাজধানী হল ঢাকা, সেযুগে তেমনি বাংলা ভাষার রাজধানী ছিল রোসাঙ্গ। এক সময় আকিয়াবের চাউল বন্যা উপদ্রুত বাংলাদেশের খাদ্যাভাব মিটাতো। মগদস্যুদের দমনে শায়েস্তা খাঁকে তারাই সাহায্য করেছিল। যার ফলে মাত্র ৩৬ ঘণ্টায় তাঁর পক্ষে চট্টগ্রাম জয় করা ও মগমুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। তাই রোহিঙ্গাদের নিকট বাংলাভাষা ও বাংলাদেশের ঋণ অনেক বেশী। আজ তারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমাদের নিকট আশ্রয়প্রার্থী। আমরা কি পারি না এই সুযোগে তাদের ঋণের কিছুটা হলেও পরিশোধ করতে? প্রশ্ন জাগে, কোলকাতার বাঙ্গালীদের প্রতি সরকারের যতটা গলাগলি, আরাকানের বাঙ্গালীদের প্রতি তার বিপরীত কেন? তারা নির্যাতিত মুসলমান, সেজন্যেই কি?

রাজনৈতিক অবস্থান :
১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে শায়েস্তা খান কর্তৃক চট্টগ্রাম দখল করে নেওয়ার আগ পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকান রাজ্যভুক্ত ছিল। তাছাড়া প্রাকৃতিক দিক দিয়ে দুর্গম ইয়োমা পর্বতমালা আরাকানকে বার্মা থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। সেকারণ নাফ নদীর তীরবর্তী টেকনাফ, বান্দরবন, কক্সবাজার ও সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চল আরাকানের সবচাইতে নিকটতম ও সুগম্য এলাকা। কিন্তু বর্তমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ ভারত ছেড়ে যাওয়ার আগে ভেদবুদ্ধি সম্পন্ন বৃটিশ ও ভারতীয় হিন্দু নেতারা কাশ্মীর, জুনাগড়, হায়দরাবাদ প্রভৃতি ভারতবর্ষের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য সমূহের ন্যায় আরাকান রাজ্যকেও ১৯৩৭ সালে বার্মার সাথে জুড়ে দেয়। অথচ ধর্ম, ভাষা ও ভৌগলিক কারণে এটা বাংলাদেশেরই অংশ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে এখানে কাষ্মীরের ন্যায় স্থায়ীভাবে রক্ত ঝরানোর ব্যবস্থা করা হয়। দেখা গেল যে, ১৯৪২ সালের এক অন্ধকার রাতে ইয়োমা পাহাড় ডিঙ্গিয়ে বর্মী শাসকদের উস্কানীতে নিরীহ আরাকানী মুসলমানদের উপর অতর্কিতে হামলা চালালো হিংস্র মগ দস্যুরা এবং মাসাধিককাল ব্যাপী হত্যাযজ্ঞে প্রায় এক লাখ মুসলমানকে তারা হত্যা করল। বিতাড়িত হ
ল কয়েক লাখ মুসলমান। এরপর ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারী বৃটিশের কাছ থেকে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর হতে নির্যাতনের মাত্রা ক্রমেই বেড়ে চলে। তাদের জন্য বার্মার নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়। ফলে তারা নিজ গৃহে পরবাসী হয়ে যায়। এইভাবে শত শত বছর ধরে মুসলিম ও বৌদ্ধ একত্রে বসবাসকারী নাগরিকদের স্রেফ রাজনৈতিক স্বার্থে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকারে পরিণত করা হয়। বার্মিজ বৌদ্ধ সন্ত্রাসীরা আরাকানী বৌদ্ধ রাখাইনদের সাথে মিলে আরাকানকে মুসলিমশূন্য করার মিশনে নেমে পড়ে। আদি ফিলিস্তীনীদের হটিয়ে যেমন সেখানে বাইরের ইহুদীদের এনে বসানো হচ্ছে, একইভাবে আদি রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করে সেখানে রাখাইনদের এনে বসানো হচ্ছে। অথচ পৃথিবী নির্বিকার।

এক্ষণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রধান দায়িত্ব হবে রোহিঙ্গাদের উপর বর্মী সন্ত্রাস বন্ধ করা এবং ১৯৪২ সালের পূর্বের ন্যায় তাদের রাষ্ট্রীয় পরিচয় ফিরিয়ে দেবার ব্যবস্থা করা। অথবা তাদেরকে স্বাধীন আরাকান রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া। বাংলাদেশ আরাকানের নিকটতম প্রতিবেশী মুসলিম দেশ। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধ্বজাধারী দুই বৃহৎ প্রতিবেশী ভারত ও চীন মুখে কুলুপ এটে মজা দেখছে। এমতাবস্থায় যদি আমরা এই মহা বিপদে তাদের সাহায্য করি, তাহ
লে আল্লাহ আমাদের সাহায্য করবেন। বিশ্বসভায় আমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। এমনকি আগামী দিনে রোহিঙ্গারাই হতে পারে আমাদের ব্যবসায়িক সহযোগী ও পূর্বমুখী কূটনীতির সেফ গার্ড। অথবা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যদি আমরা আমাদের পার্বত্য অঞ্চলে পুনর্বাসন করে দিই, তাহলে বিগত দিনে তারা যেভাবে পাহাড়-জঙ্গল কেটে আরাকানকে সমৃদ্ধ অঞ্চলে পরিণত করেছিল, সেভাবে তারা আমাদের পার্বত্য অঞ্চলকে আবাদ করে সমৃদ্ধ করে গড়ে তুলতে পারে। এ ছাড়া পার্বত্য সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে এবং দেশের এক দশমাংশের বিচ্ছিন্নতা আন্দোলন দমনে এরাই হতে পারে সরকারের শক্তিশালী হাতিয়ার।

আমরা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করছি যে, জাতিসংঘ সহ বৃহৎ রাষ্ট্রবর্গ বাংলাদেশের উপর চাপ সৃষ্টি করছে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেবার জন্য। অথচ অত্যাচারীদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে না। এতে ধরে নেওয়া যায় যে, আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক দাবাড়ুদের ইঙ্গিতেই মিয়ানমার সরকার এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালাচ্ছে। এমতাবস্থায় পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ হিসাবে বাংলাদেশকে অবশ্যই ঈমানী শক্তি নিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে হবে বিপন্ন ভাই-বোনদের পাশে। ইনশাআল্লাহ তাতে আল্লাহ্‌র গায়েবী মদদ নেমে আসবে বাংলাদেশে। ১৯৬০ সালে গবর্ণর যাকির হোসায়েনের দৃঢ় ভূমিকায় ভীত হয়ে অত্যাচারী জেনারেল নে উইন যেমন তার ঠেলে দেওয়া বিশ হাযার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে ফিরিয়ে নিতে ও তাদের বাড়ীঘরে সম্মানজনক পুনর্বাসনে বাধ্য হয়েছিল, আজকে আমাদের সরকার তেমনি শক্ত ভূমিকা নিলে মিয়ানমার সরকার প্রমাদ গণতে বাধ্য হবে। তাই প্রতিবেশী মুসলিম দেশ হিসাবে আমাদেরই দায়িত্ব রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে এগিয়ে যাওয়া।

আগামী ১৫ই জুলাই মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে আসছেন। তাঁর সামনে সর্বাগ্রে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে সাহসী ভূমিকা রাখার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানাচ্ছি। আল্লাহ বলেন, তোমাদের কি হল যে, তোমরা আল্লাহ্‌র পথে লড়াই করছ না? অথচ দুর্বল পুরুষ, নারী ও শিশুরা প্রার্থনা করে বলছে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে এই অত্যাচারী জনপদ হতে মুক্ত কর এবং আমাদের জন্য তোমার পক্ষ হতে অভিভাবক প্রদান কর এবং আমাদের জন্য তোমার পক্ষ হতে সাহায্যকারী প্রেরণ কর {নিসা ৪/৭৫} আল্লাহ্‌র এই একান্ত আহবান অবিশ্বাসী-কাফের সুচি-সোনিয়া-হুজিনতাওদের প্রতি নয়, বরং এ আহবান ইসলামে বিশ্বাসী শেখ হাসিনাদের প্রতি। যাদের হাতে বর্তমানে আল্লাহ বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা অর্পণ করেছেন। এক্ষণে যদি আমরা আমাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করি, তাহলে আল্লাহ্‌র গযবে ধ্বংস হয়ে যাব। যে গযবের হাত থেকে ফেরাঊন-নমরূদরা বাঁচতে পারেনি। তাই শুধু আমরাই নই, বিশ্বের যে প্রান্তে যে মুসলমান বসবাস করছে, বিশেষ করে মুসলিম রাষ্ট্রনেতাগণ ও মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবেরগণ এবং অর্থ-সম্পদের অধিকারী দেশের ব্যবসায়ী ও ধনিকশ্রেণী ও মানবতাবাদী সকল মানুষকে সর্বশক্তি নিয়ে এগিয়ে আসার আহবান জানাই। সেই সাথে আমাদের সরকার ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আমাদের একান্ত আহবান, রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করুন!

সকালে রাস্তায় হাঁটছি। হঠাৎ নযর পড়ল শত শত কাকের সমস্বরে কা কা ডাকের প্রতি। দেখলাম নীচে পড়ে আছে একটা আহত কাক। ঠিকভাবে চলতে পারছে না। আমাদের একজন কাকটাকে ধরে উড়িয়ে দিল। অতঃপর কাকের দল সব চলে গেল। স্থানটি ফাঁকা হয়ে গেল। দেখলাম, কাকের মধ্যে পরস্পরে ভালবাসা ও মমত্ববোধ। সেই সাথে পারস্পরিক ঐক্য ও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য। আমরা কি তাহ
লে কাকের চাইতেও অধম? ১৯৭৮ সালে নিজে গিয়েছি সাথীদের নিয়ে। শরণার্থী শিবিরে তাদের দুঃখ-কষ্টের সাথী হয়েছি। ১২ দিন বর্ষা-কাদায় ভিজে তাদের সেবা-শুশ্রুষা করেছি। ১৯৯২-য়ে সাথীদের পাঠিয়েছি। অথচ ২০১২-তে কিছুই করতে পারছি না। তাই নির্যাতিত রোহিঙ্গা ভাই-বোনদের জন্য প্রাণ খুলে দোআ করছি, হে আল্লাহ! তুমি যালেমকে পাকড়াও কর ও মযলূমকে সাহায্য কর- আমীন!

Monday, March 19, 2012

Advertisement

Image Gallery

নতুন সদস্য সংগ্রহ চলছে

ভিক্টোরিয়া কলেজ বির্তক পরিষদ আগামী ২২/০৩/২০১২ থেকে নতুন সদস্য সংগ্রহ শুরু করবে। ফর্ম পাওয়া যাবে- কলা ভবনের নীচ তলা, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ।

Wednesday, March 7, 2012

দুর্নীতি ও সড়ক অব্যবস্থাপনা


01.সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমরা যা করতে পারি

দেশে পরিবহন খাতে, বিশেষত সড়ক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে, একধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে দীর্ঘদিন ধরেএই পরিস্থিতির অনিবার্য পরিণতি হিসেবে প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছেসরকারি হিসাবে দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানির সংখ্যা বছরে চার হাজারেরও বেশিঅন্যদিকে বেসরকারি হিসাবে তা ১২ হাজারের মতো দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সংখ্যা প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছেগত ১৩ আগস্ট একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনীর এবং তাঁদের তিনজন সহযোগীজামাল, মোস্তাফিজ ও ওয়াসীমের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় গোটা দেশ কেবল স্তম্ভিতই হয়ে পড়েনি, এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধেও সোচ্চার হয়ে উঠেছিলএর আগে গত ১১ জুলাই মিরসরাইয়ে ৪২ জন শিশু অকালে প্রাণ হারায় আরেক দুর্ঘটনায়, যা সারা দেশের মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল২৮ জুলাই বগুড়ার শাজাহানপুরে ১৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেবছরের গোড়াতে কর্তব্যরত অবস্থায় দুজন কর্মকর্তাসহ ১০ জন পুলিশ নরসিংদীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হনএ বছরের জুলাই মাসে ১৭৩ ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেনএকইভাবে নভেম্বর মাসে এক দুর্ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের ছাত্রী নাদিয়া সুলতানাসহ চারজন মারা গেছেনসফটওয়্যার প্রকৌশলী ও সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান টুগেদার ইনিশিয়েটিভ লিমিটেডের পরিচালক মনোয়ারুল হাসান এবং তাঁর স্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিত্সক নাহিদ রোকসানা প্রাণ হারিয়েছেনদিনাজপুরে নিহত হয়েছেন তিনজন ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম, নভেদা বেগম ও জবেদা বেগমএই তালিকা যে অনেক বড়, তা সবাই জানেনএসব ঘটনার পাশাপাশি, বিশেষত ১৩ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার অব্যবহিত পূর্বেই এ তথ্য সবাই জানতে পেরেছেন, নৌপরিবহনমন্ত্রীর সুপারিশে ২৪ হাজার লোককে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স প্রদানের চেষ্টা চলছেঅতীতে একই প্রক্রিয়ায় ১৪ হাজার ব্যক্তিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে১৯৯০ সাল থেকে পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়ার এই প্রক্রিয়া চালু হয় এবং তা এখনো অব্যাহত রয়েছে
সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কেবল চালকদের অদক্ষতাই যে একমাত্র কারণ নয়, তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা দেশের পথঘাটগুলোর অবস্থা লক্ষ করি১৩ আগস্টের দুর্ঘটনার ঠিক আগে আগেই দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং বাস-ট্রাক মালিকেরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহন চালাতে অস্বীকার করেদেশের প্রধান প্রধান শহরের রাস্তাঘাটে গত এক দশকেও কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনিতদুপরি দেশের প্রচলিত আইনগুলো ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাদি এতই দুর্বল যে এগুলো সময়োপযোগী নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলোও বাস্তবায়ন করা হয় নাপরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছুটা সুস্পষ্ট হয় যখন দেখি মোটরযানের মালিকানার সংখ্যা অনুপাতে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ হতাহতের ঘটনা বাংলাদেশে ঘটে (১০০০ মোটরযানের বিপরীতে ১০০ মৃত্যুর ঘটনা)তা ছাড়া, দেশে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম মূল কারণ হিসেবেও সড়ক দুর্ঘটনা আবির্ভূত হয়েছেজাতীয় মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনার ৩৮ শতাংশ ঘটতে দেখা যাচ্ছেআর অনুমান করা হয় যে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে চিকিত্সাসেবা নিতে বাধ্য হয়সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক দিকটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণএক হিসাবে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক মূল্য জিডিপির প্রায় ২ শতাংশএ ধরনের নানা বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম ইতিমধ্যে সম্পাদিত হলেও সমাধানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে
পরিবহন খাতের এসব সমস্যার বিষয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া তথ্য ও জনগণের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে ১৩ আগস্টের পর নৌপরিবহনমন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ ও অপসারণের দাবি ওঠে সমাজের সর্বস্তর থেকে তৃণমূল পর্যায় থেকে এ নিয়ে বিক্ষোভ, সমাবেশ, মিছিল সত্ত্বেও দুজন মন্ত্রী তা প্রত্যাখ্যান করেনতদুপরি প্রধানমন্ত্রী সংসদ ও সংসদের বাইরে সুস্পষ্টভাবে মন্ত্রিসভার সদস্যদের ওপর তাঁর আস্থার কথা বলেন এবং মন্ত্রীদের পদত্যাগের দাবি নাকচ করে দেনপ্রধানমন্ত্রীর নাকচের আগে দেশের পরিবহন খাতের এই পরিস্থিতির জন্য অর্থ বরাদ্দ নিয়ে অর্থমন্ত্রী ও পরিবহনমন্ত্রী পরস্পরকে দোষারোপ করেনদেশের সর্বোচ্চ আদালত এই খাতের বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব দাখিল করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন
গত কয়েক সপ্তাহের আলাপ-আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, দেশের সড়ক পরিবহনব্যবস্থা এখন এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়েছে, যাকে কেবল নৈরাজ্যকর বলাই যথেষ্ট নয় বাংলাদেশের সড়কগুলো যে দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়, তা এখন সবার কাছেই স্পষ্ট এবং তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেইযার সহজ অর্থ হচ্ছে যে, আমরা প্রতিদিনই দেশের অসংখ্য মানুষকে অসময়ে হারাচ্ছি; যাদের মধ্যে অনেকেই খ্যাতিমান, অনেকেই সম্ভাবনাময়এই অবস্থা আর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় নাতৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্রই এখন এই অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি অবসানের দাবি উঠেছেএই পরিস্থিতিতে দেশের সচেতন সাধারণ মানুষের করণীয় কী? অনেকেই এই প্রশ্ন করছেন
আমাদের ধারণা, সড়ক পরিবহন খাতের নৈরাজ্যের অবসান এবং প্রতিদিন সংঘটিত দুর্ঘটনা, যা সহজেই পরিহারযোগ্য, মোকাবিলার জন্য আমাদের করণীয় কাজকে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারিএগুলো হচ্ছে: জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরি ও তার কাঠামো তৈরি; সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে মডেল তৈরি; এবং এই খাতের সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সমস্যার বিভিন্ন দিক সুনির্দিষ্ট করে জাতীয় পর্যায়ে নীতি ও কর্মপদ্ধতি তৈরি করা
জবাবদিহির সংস্কৃতি ও কাঠামো
সড়ক পরিবহন খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনা অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও দেশের সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো রকম দায়িত্ব গ্রহণ করার কোনো মনোভাব প্রদর্শন করেনি১৩ আগস্টের পর সংশ্লিষ্ট দুজন মন্ত্রী যে কেবল পদত্যাগ করতেই অস্বীকার করেছেন তা নয়, তাঁরা এ জন্য কোনো রকম দায়িত্ব পর্যন্ত নেননিযোগাযোগমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর মধ্যে প্রকাশ্য বিতর্কেও দেখা যায়, কেউই মনে করেন না যে অব্যাহত এই পরিস্থিতির জন্য সরকার ও কোনো সংস্থার দায়িত্ব রয়েছেজবাবদিহির এই অভাব কেবল পরিবহন খাতেই রয়েছে তা নয়, সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যান্য ক্ষেত্রেও তা সমভাবে উপস্থিতস্মরণ করা দরকার যে এটি কেবল বর্তমান সরকারেরই বৈশিষ্ট্য নয়১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর আশা করা হয়েছিল, সরকার জনসাধারণের কাছে জবাবদিহির পরিচয় দেবেনকোনো রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় যাওয়ার পর এ বিষয়ে কোনো রকম উত্সাহ দেখায়নিপরিবহন খাত নিয়ে সারা দেশের মানুষের ক্ষোভের পটভূমিকায় প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ও পদক্ষেপ জবাবদিহির অভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছেএই বিষয়টি বোঝার জন্য জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন দলের একজন শীর্ষপর্যায়ের নেতার মন্তব্যই যথেষ্ট:দায়িত্ব নেওয়ার জন্য এখন আর কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না
জবাবদিহি গণতন্ত্রের একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের মতোই একটি অধিকারআর তাই সবার কর্তব্য হচ্ছে জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরির জন্য দাবি তোলা ও চাপ প্রয়োগ করাএই লক্ষ্যে দরকার জবাবদিহির জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোকে শক্তিশালী করাবাংলাদেশ সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে যে ন্যায়পালের কথা বলা হয়েছে, তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার দাবি হচ্ছে জবাবদিহির সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টপ্রত্যক্ষভাবে পরিবহন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো, সংশ্লিষ্ট মালিক-শ্রমিক ইউনিয়ন, মন্ত্রণালয়, এসবের কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যত্যয় ঘটালে তার দায়িত্ব কার ওপর বর্তায়, তা সবারই জানার অধিকার রয়েছেতার জন্য সাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা দরকার এবং সরকারকে এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা তৈরিতে বাধ্য করা দরকার
স্থানীয়ভাবে সমস্যা মোকাবিলা করা
পরিবহন খাতের সমস্যা জাতীয় পর্যায়ের সমস্যা হলেও একে স্থানীয়ভাবে কী করে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে আমাদের ভাবা দরকারসম্প্রতি বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলায় আমাদের গ্রাম প্রকল্পের উদ্যোগে পরিবহন বিশৃঙ্খলা নিরসনে একটি স্থানীয় উদ্যোগ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্যএলাকার জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতারা, পরিবহন সেক্টরের প্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, এনজিওসহ সমাজের বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিদের এই উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা হয়েছেসবচেয়ে বেশি এগিয়ে এসেছে পরিবহনশ্রমিক এবং এ খাতে বিনিয়োগকারীরাইএদের বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, সড়কের নৈরাজ্য এ খাতকে ক্রমাগত লোকসানের দিকেই ঠেলে দেয়তাই এই অবস্থা তাদের কাম্য নয় ছাড়া নেতিবাচক পরিস্থিতি নিম্ন আয়ের শ্রমিকদেরই ভোগায় বেশিরামপালের উদ্যোগে তাই একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, যেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী কর্মকর্তা, অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষকমণ্ডলী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, পরিবহনশ্রমিক-মালিক সবাই মিলে নিশ্চিত করবে যে নিজেদের এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে নাএই দুর্ঘটনামুক্ত উপজেলাগঠনের প্রতিশ্রুতি প্রতিটি এলাকার শান্তি ও নির্বিঘ্ন পথ চলাচলের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে
জাতীয় পর্যায়ে নীতি ও কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন
আমরা এমন এক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনাগুলো জ্যমিতিক হারে বাড়তে দেখছি, যখন মাত্র কয়েক মাস আগে জাতিসংঘের নিরাপদ সড়কসংক্রান্ত কর্মসূচির (UN Decade of Action for Road Safety 2011-20) সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার বেশ ঘটা করে একাত্মতা ঘোষণা করেছেযোগাযোগ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত চমত্কার সব ডকুমেন্ট আর নিরীক্ষা-রিপোর্ট দেখলে যে কারও মনে হতে বাধ্য যে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমাদের অগ্রগতি সন্তোষজনক কিন্তু বাস্তবতা কতটা ভিন্ন, তা দেশের সাধারণ মানুষ ভালোই জানেনআমরা মনে করি, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যেসব সরকারি-বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে, তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছেতা ছাড়া বুয়েট বা ব্র্যাকের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ যেসব গবেষণাকর্ম হচ্ছে, সে সম্পর্কেও নাগরিক সমাজ ভালোভাবে জানার সুযোগ পাচ্ছে নাএতে সরকারের প্রতি চাপ প্রয়োগ এবং দাবি আদায়ের কর্মকৌশল নিয়ে নাগরিক সমাজ ততটা কার্যকরভাবে উত্সাহী মনোভাব দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেআমরা এই অবস্থার একটি আশু সমাধান চাইআমরা আরও মনে করি, প্রচলিত এবং জনপ্রিয় কর্মসূচির বাইরেও নাগরিক সমাজের নানা রকমের উদ্যোগ নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, যা টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগোতে পারবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে ব্যাপারে আমরা একটি জাতীয় কনভেনশন আয়োজন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি, যেখানে স্বার্থসংশ্লিষ্ট সবাই অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেএই কনভেনশনের কয়েকটি দিক নিয়ে আমাদের ভাবনাগুলো নিচে দেওয়া হলো:
সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনার সিংহভাগই সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও গুটিকয়েক এনজিওর মধ্যে আমরা সীমিত থাকতে দেখেছিআমরা মনে করি, এতে নিরাপদ সড়কসংক্রান্ত নানা উদ্যোগের সঙ্গে জনমানুষের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয় নাতাই প্রস্তাবিত জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে আমরা একটি জাতীয় ফোরাম গঠন করতে পারি, যেখানে বিভিন্ন ধাপে বুয়েটের কিছু বিভাগ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের গবেষক, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা/সচিব, ডাক্তার, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রতিনিধি, ঠিকাদার, সাংবাদিক, এনজিও কর্মী, মনোবিজ্ঞানী ও ভিকটিমদের পরিবারের প্রতিনিধিরা স্থান পাবেন
জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে পরিচিত করানোর একটি সুযোগ থাকবে একই সঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দলের কাছে থেকে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক রাজনৈতিক অঙ্গীকার আদায়ের বিষয়টিও থাকবেএ ব্যাপারে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানানো হবেসড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা তহবিল গঠন, মহাসড়কগুলোর কাছাকাছি দুর্ঘটনার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ নতুন ধরনের কিছু প্রস্তাব আমরা এই কনভেনশনের মাধ্যমে সরকারের কাছে পেশ করতে পারিএই উদ্যোগে বেসরকারি সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের জাতীয় সংগঠনকে অঙ্গীভূত করতে হবে
সড়ক নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সফলতাগুলো কীভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কাজে লাগানো যায়, সে ব্যাপারে কর্মকৌশল প্রণয়নযেসব সংস্থা ও নাগরিক উদ্যোগ বিভিন্ন দেশে কাজ করছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনতা ছাড়া, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভাগীয় পর্যায় থেকে শুরু করে কীভাবে থানা পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নাগরিক সমাজ যুক্ত হতে পারে, তার দিকনির্দেশনা প্রণয়ন
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে শিশু শিক্ষা কর্মসূচির একটি পরিকল্পনার কথা আমরা জানতে পেরেছি, যা উত্সাহব্যঞ্জকতবে এ ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগ (ইন্টারনেটে এ-সংক্রান্ত ডকুমেন্টগুলো বেশ সহজলভ্য) বিবেচনায় এনে নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজনীয়
বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে প্রচলিত ক্যাম্পেইন কৌশলে পরিবর্তন আনা প্রয়োজনমনে রাখতে হবে, সড়ক ব্যবহারকারীদের সবারই অভ্যাস ও আচরণ পরিবর্তন করা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়কাজেই প্রস্তাবিত জাতীয় কনভেনশনে মনোবিজ্ঞানী এবং পাবলিক ক্যাম্পেইন বিশেষজ্ঞদের নতুন ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ থাকবে
নিরাপদ সড়ক নিয়ে গবেষণা ইনস্টিটিউট গঠনের প্রয়োজনীয়তা বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছেআমরা মনে করি, এ খাতে গবেষণা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজনএ লক্ষ্যে বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে সাহায্য করা জরুরিঅন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পরিবহন খাতে যারা ব্যবসা করছে, তাদেরকে এই অর্থায়ন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে উত্সাহিত করা দরকার
প্রস্তাবিত জাতীয় কনভেনশনটির একাধিক দিক থাকতে পারেএখানে গবেষণাভিত্তিক লেখালেখি থেকে শুরু করে প্রস্তাব/কর্মকৌশল সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আহ্বান করা যেতে পারেঅন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদেরও আমন্ত্রণ করা হবে, যাতে করে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার আদায় সম্ভব হয়চূড়ান্তভাবে এই কনভেনশনের মাধ্যমে সরকার, এনজিও ও নাগরিক সমাজের এই পারস্পরিক যোগাযোগের সম্পর্ক তৈরি ও অব্যাহত রাখা এবং এর ওপর ভিত্তি করে নিরাপদ সড়ক নিয়ে নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার কাজে এগোতে হবে
উল্লিখিত তিনটি করণীয় সামনে রেখে পরিবহন খাতের নৈরাজ্য অবসান এবং সবার জন্য নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টাকে একত্র করা জরুরিএ বিষয়ে বোধ করি কারোরই সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশে সড়ক অব্যবস্থাপনার সঙ্গে আর্থিক দুর্নীতি ও অসততা জড়িয়ে আছেতাই অনেকেই নাগরিক সমাজের নানা উদ্যোগের সফলতার ব্যাপারে সন্দিহান থাকেনতবে আমরা বিশ্বাস করি, এ ব্যাপারে নাগরিক সমাজের ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ ও লেগে থাকবারকৌশল একসময় সামাজিক সচেতনতা তৈরি করবেই এবং অব্যবস্থাপনার বিষয়টি আমরা একসময় সবাই মিলেই কাটিয়ে উঠতে পারবতৃণমূল পর্যায় থেকে, বিশেষ করে ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবী-জনতাফোরাম থেকে যেসব দাবি উঠেছে, তার মধ্যে যেমন আশু দাবি রয়েছে তেমনি রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের আকাঙ্ক্ষাসমস্যা সমাধানে জনসম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখতে তৃণমূলের স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমর্থন অব্যাহত রাখা দরকারপাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে যারা সক্রিয়, তাঁদের এই প্রচেষ্টায় অঙ্গীভূত করা প্রয়োজনসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য সংস্থা, গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের যথাযথ অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো রকম দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা যাবে নাদীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করা, তার বাস্তবায়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং তার জন্য অব্যাহত চাপ প্রয়োগের জন্যই সবাইকে একটি প্ল্যাটফর্মে শামিল করাতে আমাদের উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যেন আমরা আমাদের ভবিষ্যত্ বংশধরদের বলতে পারি, আরেকটি মিরসরাইয়ের ঘটনা কখনোই ঘটবে না

 02.

মহাসড়ক সংস্কারে দুর্নীতি


সারাদেশের ভাঙ্গাচুরা-গর্তেভরা যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী সড়ক-মহাসড়কগুলোর বিভিন্নস্থানে তড়িঘড়ি সংস্কারের নামে কয়েক শ কোটি টাকা ব্যয় করে জোড়াতালি দেয়া হয়েছেইটের খোয়া আর বালি দিয়ে জোড়াতালির রাস্তা মাত্র দুই সপ্তাহ যেতে না যেতেই আবারো ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছেফলে যানবাহনের চালক ও যাত্রী সাধারণের ভোগান্তির পরিত্রাণ মিলছে নাঈদুল ফিতরের আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে ফেলানো ইট, সুরকি ও বালি উঠে গিয়ে আবারো ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছেমাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে অত্যন্ত জরুরিভিত্তিতে মেরামত করা রাস্তা আবার আগের বেহাল অবস্থায় ফিরে গেছে এবং আগের মতোই যানবাহন চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি হচ্ছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম বাজারের কাছে প্রায় এক কিলোমিটার, ফেনীর মহিপালে এক কিলোমিটার এবং মিরসরাই উপজেলার প্রায় ৪০ কিলোমিটার অংশ ঈদের আগে ইট, খোয়া আর বালি দিয়ে ভরাট করা হলেও বৃষ্টির পানিতে ধুয়েমুছে ছোট-বড় গর্ত এবং এবড়ো-থেবড়ো অবস্থা আবার বেরিয়ে পড়েছেএই মহাসড়কে প্রতিদিন শত শত যানবাহন মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেএই অবস্থা চলতে থাকলে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা কেবল বেড়েই যাচ্ছেঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ত্রিশাল বাসস্ট্যান্ড থেকে নওধার এলাকা পর্যন্ত দুই কিলোমিটার রাস্তা খোয়া আর বালি দিয়ে মেরামত করা হলেও খোয়া উঠে গিয়ে সারা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে ময়মনসিংহ থেকে গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস মোড় পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত অংশে ঈদের আগে তাড়াহুড়া করে সম্পন্ন করা মেরামত কাজ টিকছে নাএতে জনভোগান্তির পাশাপাশি যানবাহন চলাচলে ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছেঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে কোনাবাড়ি এলাকায় প্রায় এক কিলোমিটার রাস্তা আবারো যানবাহন চলাচলের অনুযযোগী হয়ে পড়েছেসারাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর বেহালদশার প্রধান কারণই হচ্ছে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও নাজিরবিহীন দুর্নীতিসড়ক ও জনপথ অধিদফতর (সওজ) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগে (এলজিইডি) দুর্নীতির উৎসব চলার কারণে সরকারের পরিকল্পনানুযায়ী সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কার কাজ করা সম্ভব হয় নাগত শনিবার একটি দৈনিকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দরপত্র আহবান থেকে শুরু করে নির্মাণ কাজ পর্যন্ত চলে অবাধ দুর্নীতি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে যেনতেনভাবে নির্মাণ ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হলেও সওজের গুরুত্বপূর্ণ পদের কর্মকর্তাদের আর্থিক জৌলুস দিন দিন বেড়েই চলেছে বিনা টেন্ডারে রাস্তা-মেরামতের কাজে ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা, রোড কাটিং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের নামে ৩৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং ২৫ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণে ১৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য সওজের বার্ষিক অডিট রিপোর্টে পাওয়া গেছেঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে এক ট্রাক বালি ফেলে ১২ ট্রাক বালির টাকা উঠিয়ে নেয়ার অভিযোগও আছেদীর্ঘদিন ধরেই রাজধানী ঢাকা মহানগরীর রাস্তাঘাট এবং সেইসাথে সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কগুলোর সর্বোপরি প্রতিটি জেলা ও উপজেলার সড়কগুলোর বেহালদশা নিয়ে দৈনিক সংগ্রামসহ সব পত্র-পত্রিকায় বিরামহীনভাবে লেখালেখি হলেও জনভোগান্তি নিরসনে সরকার ও তার সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের যেন কোনো দায়িত্ববোধ জাগ্রত হচ্ছে নাযানবাহন ও রোড ট্যাক্স বাবদ সরকার জনগণের কাছ থেকে যে অর্থ আদায় করে নেয় সে অর্থ রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার কাজে যথাযথভাবে ব্যয় করা হলে দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়রাস্তাঘাট যান চলাচল উপযোগী থাকলে যানজটও কম হয়খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী অল্প সময়ে সারাদেশে আনা-নেয়া করা যায় জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকেআর ব্যবসা-বাণিজ্যে থাকে চাঙ্গাভাবসামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির চাকা দ্রুত সামনের দিকে এগুতে থাকেকিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে, যানবাহন ও রাস্তা ব্যবহার বাবদ প্রদত্ত ট্যাক্স ছাড়াও বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য সরকারের বরাদ্দ অর্থের সদ্ব্যবহারের পরিবর্তে লুটপাটই চলে বেশিগত অর্থবছরে সড়ক ও জনপথ উন্নয়নে ১০৩টি প্রকল্পের বিপরীতে সরকারের বরাদ্দ এক হাজার ৭২৬ কোটি ৬ হাজার টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি বলে রাস্তঘাটের অচলাবস্থার শিকার হতে হয়েছে দেশের সাধারণ মানুষকে২০০৫-০৬ ও ২০০৬-০৭ অর্থ বছর পর্যন্ত সম্পন্ন অডিটে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরে ২৫২ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছেক্ষমতার অপব্যবহার করে একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা বাড়ি-গাড়ি, জমি-জমাসহ অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেনঅনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও পাবলিক এ্যাকাউন্টস কমিটির তদন্ত অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছেসারাদেশের রাস্তাঘাটের চরম বেহালদশার কথা মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজ বন্ধ না রেখে সড়ক ও মাহসড়কগুলোতে নির্মাণ ও মেরামতের নামে যাবতীয় অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবেপরবর্তীতে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর থেকে দুর্নীতি নির্মূলের পদক্ষেপ নিতে হবে
দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখার লক্ষ্যে সড়ক-মহাসড়কগুলোর সারাবছরই যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাখার কোনো বিকল্প নেইপ্রায়শ বৃষ্টি-অতি বৃষ্টি, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা, সড়ক-মহাসড়কে যানবাহনের প্রচন্ড চাপ, রাস্তা সংস্কারে অর্থছাড়ে বিলম্বসহ অন্যান্য সমস্যা-সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রাস্তা সংস্কার কাজকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবেসংস্কার বা মেরামতের পর এক দুই সপ্তাহ না যেতেই রাস্তঘাট আবার আগের বেহাল অবস্থায় ফিরে যাওয়া কোনো অবস্থাতেই মেনে নেয়া যেতে পারে না সারাদেশের সড়ক-মহাসড়ক সংস্কারে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই যদি এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রে ব্যাপক তদন্ত সাপেক্ষে দুর্নীতির সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেয়া উচিতদুর্নীতির মূলোউৎপাটন করতে না পরলে জনভোগান্তি নিরসনের কোনো আশাই করা যায় নাঅতএব, দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কার কাজের সকল পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি চিরদিনের জন্য নির্মূল করতেই হবে

03.

সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি অদতা অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ৭০ ভাগ মহাসড়ক যান চলাচলের অনুপযোগী

সরকারের ব্যর্থতা আর অব্যবস্থার কারণে এবার ঈদে অনেকেরই বাড়ি ফেরা হবে নাঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মহ্নাগরী ও শহরে চাকরি ব্যবসা বা কাজের প্রয়োজনে স্বজন বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাসকারী মানুষ সারা বছর প্রতীায় থাকেন ঈদের এই দিনটির জন্যইউরোপ আমেরিকার মতো উন্নত দেশের মানুষ প্রতিবছর বড়দিনে লম্বা ছুটি পানআমাদের দেশের হতভাগাদের কপালে ঈদ উৎসবের মতো বড় আয়োজনেও ৩ দিনের বেশি ছুটি মেলে নাএবারের এ তিনদিনের ছুটিও অধিকাংশ মানুষের কাটবে স্বজন বিচ্ছিন্ন হয়েকারণ শেখ হাসিনা এরশাদ মেননের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, অদতা অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ৭০ ভাগ মহাসড়ক যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছেসড়ক ও জনপদ সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার সড়ক-মহাসড়কের মধ্যে অন্তত ১৫ হাজার কিলোমিটার রাস্তা সংস্কারের অভাবে যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী৫০ পয়েন্টের অবস্থা চরম খারাপ সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের অধীনে সারাদেশে সড়কের পরিমাণ ২১ হাজার ৫৭১ কিলোমিটার এর মধ্যে জাতীয় মহাসড়ক ৬ হাজার ৪৪৫ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪ হাজার ১০৫ কিলোমিটারজেলা সড়ক রয়েছে ১০ হাজার ৬০৬ কিলোমিটারপ্রতিবছর কি পরিমাণ রাস্তা নষ্ট ও এই রাস্তা  মেরামতে কি পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা নির্ধারণ করে সওজের মহাসড়ক উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগএ বছর বর্ষা শুরুর আগে ১২ হাজার ৪২৮ কিলোমিটার তিগ্রস্ত রাস্তা মেরামতের জন্য খসড়া সুপারিশমালা তৈরি করে সওজএর মধ্যে ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা পুরোপুরি যানবাহন চলাচলের অনুপযোগীধারণা  জরুরিভাবে ১৫ হাজার কিলোমিটার রাস্তা এখনই সংস্কার করা দরকারযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, দেশে ৯টি জাতীয় মহাসড়কের দূরত্ব তিন হাজার কিলোমিটারদেশে ৩৫০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক, ৫৩০ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক, এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার জেলা সড়ক মারাত্মকভাবে তিগ্রস্ত 
পরিবহন মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান, অবস্থার পরিবর্তন না হলে দেশের অন্তত ৪০ জেলার সাথে রাজধানীর যোগাযোগ রা করা সম্ভব হবে নাদেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল শুরু হলেও রাস্তা নষ্ট থাকায় ৩০ ভাগ যানবাহন চলাচল করেছে মাত্র যানজটের কারণে ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ২ ঘণ্টার রাস্তা যেতে সময় লাগছে ৭-৮ ঘণ্টারও বেশি
এদিকে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে অন্তত ৫০টি পয়েন্টে রাস্তার বেহাল চিত্রঅপরিকল্পিত নগরায়ন ও কলকারখানার কারণে সৃষ্টি হচ্ছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতারডুবছে রাস্তামহাসড়কের ১০ পয়েন্টে হাঁটুপানিকোথাও কোথাও মহাসড়ক ধারণ করেছে ডোবা ও খালের আকৃতিফলে দিন দিন বাড়ছে দুর্ঘটনা রাস্তার মাঝে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে গাড়ি ফলে সৃষ্টি হচ্ছে লম্বা যানজট
এদিকে প্রকৌশলীরা বলছেন, দুই বছর অন্তর অন্তর রাস্তার ওপর লেয়ার না দেয়ার কারণে মহাসড়কে মহাবিপর্যয় দেখা দিয়েছে
গাড়ি চলাচলের কারণে বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট ছোটখাটো ক্রুটি তাৎণিক সংস্কার না হওয়ায় তা বড় আকার ধারণ করেছেকথায় আছে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ১২২ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে প্রায় ৯০ কিলোমিটার যান চলাচলের অনুপযোগী
ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কের এলেঙ্গা-মির্জাপুর ও মির্জাপুর-টাঙ্গাইল শহর পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার সড়কে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছেটানা বর্ষণের কারণে গর্তে পানি জমে ডোবায় রূপ নিয়েছেএছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর থেকে বড় দারোগাহাট পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তা খানাখন্দে ভরাতবে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এই সড়কের ১৯২ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ২১টি পয়েন্টের অবস্থা যান চলাচলের অনুপযোগীযশোর-খুলনা মহাসড়কের প্রায় ৬০ কিলোমিটারে অবস্থা বেশি খারাপখানাখন্দ আর ছোট-বড় গর্তে পানি জমে দুর্ভোগ চরমে উঠেছে যাত্রীসহ পরিবহন সংশ্লিষ্টদেরখুলনা-সাতীরা মহাসড়কের প্রায় দুই কিলোমিটার পানিতে ডুবে গেছেএই সড়কের প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ ব্যবহারের অনুপযোগীতালা-পাইকগাছা সড়কের ১০ কিলোমিটার দু-তিন ফুট পানির নিচেএকটু বৃষ্টি হলেই ওই সড়ক দিয়ে এখন নৌকা চলাচল করে
সওজ ২০১০-১১ অর্থবছরে মহাসড়ক মেরামতের যে হিসাব দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, সারাদেশে অন্তত ৭০০ কিলোমিটার সড়ক জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করা প্রয়োজন কিন্তু সওজ এসব সড়ক মেরামত করেনিএখন টানা বর্ষণের কারণে এই মহাসড়কগুলোর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছেএছাড়াও মেরামতের অভাবে প্রায় একই অবস্থা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও মির্জাপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত সড়ক, কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়ক, ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কের বনপাড়া-হাটিকুমরুল অংশ ও যশোর-খুলনা মহাসড়কএছাড়াও সিরাজগঞ্জ, বরিশাল, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, ফেণী, সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন মহাসড়কের চিত্র বেহাল
টাকা খরচ হয়েছে কিন্তু কাজ হয়নি
সড়ক জনপথ ( সওজ) সূত্রে প্রকাশ, গত তিন অর্থ বছরে সড়ক উন্নয়ন ও রণাবেণ কাজে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০ হাজার ১৬৩ কোটি টাকাবরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে খরচ হয়েছে ১৯ হাজার ৪১৪ কোটি টাকাউল্লিখিত ৩ অর্থ বছরে তাদের বরাদ্দ ছিল ৭ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকাআর তাদের ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকাঅন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ১২ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছেউন্নয়ন ও রাজস্ব খাত মিলে তাদের অর্থ ফেরত যাওয়ার ঘটনা নেই বললেই চলেএতো বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও বর্ষা মৌসুমে দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক নাজুক অবস্থায় পৌঁছার পর সড়ক সংস্কারের দাবিতে কয়েকটি রুটে গত কয়েকদিন ধরে বাস ধর্মঘটের মতো ঘটনা ঘটে
সওজ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে উন্নয়ন ও রাজস্ব মিলিয়ে তাদের ব্যয় হয়েছিল ১ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকাএই বছরে তাদের উন্নয়ন খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকাআর উন্নয়ন ব্যয় ছিল ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকাপরের বছর অর্থাৎ ২০০৯-১০ অর্থ বছরে দুই খাত মিলিয়ে ব্যয় হয় ২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকাএ বছর উন্নয়ন খাতের ২ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকাআর ২০১০-১১ অর্থ বছরে দুই খাতে ব্যয় দাঁড়ায় ২ হাজার ৫০৯ কোটি টাকাএ বছরে উন্নয়ন বরাদ্দ ২ হাজার ৬৩ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয় ছিল ১ হাজার ৮৪২ কোটি টাকাসূত্র জানান, রাজস্ব খাতে তাদের বরাদ্দ ও ব্যয়ে তেমন কোনো পার্থক্য নেই
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে উন্নয়ন ও রাজস্ব মিলিয়ে তাদের ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকাপরের বছর (২০০৯-১০ অর্থ বছরে) ব্যয় হয় ৪ হাজার ৪২৮ কোটি টাকাআর ২০১০-১১ অর্থ বছরে তাদের ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকাসূত্র জানায়, উভয় বিভাগের এই হিসাবের মধ্যে দাতা ও সরকার প্রদত্ত অর্থ রয়েছেএ বিষয়ে তথ্য সংগহের সময় জানা যায়, সওজের ২১ হাজার কিলোমিটার ও এলজিইডির ৮০ হাজার কিলোমিটার (পিচ ও ইটের রাস্তা মিলিয়ে) পাকা সড়ক রয়েছেসওজ এর আওতাধীন জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও জেলা সদরের সঙ্গে উপজেলা গ্রোথ সেন্টারের সংযোগকারী জেলা সড়কগুলোর (ফিডার রোড) অবস্থা সবচেয়ে খারাপসওজের দায়িত্বশীল সূত্র বলেছেন, রণাবেণ কাজে আমাদের যে চাহিদা সে অনুযায়ী আমরা বরাদ্দ পাই নাসে কারণে অনেক সময় জরুরি মেরামত কাজেও হাত দেয়া যায় নাগত অর্থ বছরে অর্থমন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নিয়ে আমরা উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ দিয়ে রাজস্ব খাতের কাজ করেছিতাছাড়া আরও দুইটি বিষয় আছে যা রণাবেণ বরাদ্দের উপর চাপ সৃষ্টি করেএর মধ্যে প্রথমটি হলো বকেয়া বিলরণাবেণ বরাদ্দ ছাড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি বড় অংশ আগের বকেয়া বিল পরিশোধে চলে যায়এরপর আছে অস্থায়ী কর্মচারী এই অস্থায়ী কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি যায় রণাবেণ তহবিল থেকেসারাদেশ জুড়েই সড়ক বিভাগে অস্থায়ী কর্মচারী আছেকিন্তু তাদের মোট সংখ্যাটি কত সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি
এলজিইডি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রওশন কবীর জানিয়েছেন, তাদের পাকা সড়ক নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ৮০ হাজার কিলোমিটার (পিচ ও ইটের রাস্তা মিলিয়ে)এর বাইরে রয়েছে মাটির রাস্তাতিনি উল্লেখ করেন উপজেলা রোড, ইউনিয়ন রোডের প্রায় ৬০ শতাংশ পাকা হয়ে গেছেসব মিলিয়ে আমাদের সড়ক নেটওয়ার্ক এখন যথেষ্ট ভালো অবস্থায় পৌঁছেছেপ্রয়োজন হলো নিয়মিত রণাবেণ করাএলজিইডির অন্য একটি সূত্র জানান, চলতি বছর রাজস্ব খাতে অর্থ প্রদানে সমস্যা থাকায় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের উন্নয়ন খাত থেকে ২ হাজার কোটি টাকা নিয়ে কয়েকটি সড়ক জরুরি ভিত্তিতে রণাবেণ ও প্রশস্তকরণের জন্য পরামর্শ দেয়া হয়েছে
একটি সূত্র জানায়, বরাদ্দকৃত টাকা যথাযথভাবে খরচ না করে লুটপাট হওয়ায়, নতুন নির্মিত সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়াঅবশ্য প্রকৌশলীরা ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন, বহন মতার অতিরিক্ত পণ্য বোঝাই ট্রাকের কারণে সড়ক নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্ত হয়বাংলাদেশে সাধারণত সিঙ্গেল এক্সেলের ট্রাকই বেশি চলাচল করেইদানিং কিছু ডাবল বা মাল্টি এক্সেলের ট্রাক আসছেকিন্তু তা সংখ্যায় অতি নগণ্যডাবল বা মাল্টি এক্সেলের একটি ট্রাক বিদ্যমান সড়ক ব্যবস্থাতেই একসঙ্গে অনেক বেশি পণ্য পরিবহন করতে পারেএেেত্র পণ্যের ওজন অনেকটা স্থান জুড়ে ভাগ হয়ে যাওয়ায় সড়কের তির সম্ভাবনা কমে যায়কিন্তু এ ধরনের ট্রাকের দাম অনেক বেশি হওয়ায় বোধগম্য কারণেই পরিবহন ব্যবসায়ীরা ৫ থেকে ৭ টনের সিঙ্গেল এক্সেল ট্রাকে অতিরিক্তি পণ্য বোঝাই করে নিজেদের মুনাফা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যায়এ রকম একটি ট্রাক অনেক সময় ২১ টন পর্যন্ত পণ্য নিয়েও রাস্তায় চলাচল করেএই অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাকের ভার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো কোনো রকমে সামলালেও জেলা বা উপজেলা সড়কগুলো তা সামলাতে পারে না সেজন্যই প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেলে ব্রিজ, কালভার্ট ভেঙে বা সড়ক ধসে গিয়ে ট্রাক আটকে থাকার দৃশ্য ইদানিং খুব স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে
ঘরমুখো মানুষের বিড়ম্বনা
আসন্ন ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো যাত্রীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে নেয়া কোনো পদপেই কাজে আসছে নাবাস ও লঞ্চের অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করতে গিয়ে যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেনঈদে ঘরমুখো মানুষদের পণবন্দি করে টিকিটের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে পরিবহন কোম্পানিগুলোপ্রতিবারের মতোই এবারো টিকিটের বেশি দাম নেয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরাযাত্রীদের অভিযোগ, লঞ্চ ও বাস মালিকরা শেষ মুহূর্তে বেশি দামে বিক্রির উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে টিকিট বিক্রি বন্ধ রেখেছেন
দণি-পশ্চিমাঞ্চলগামী বাস সার্ভিসগুলোর কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ কাউন্টারেই ২৯ ও ৩০ আগস্টের টিকিট বিক্রি হয়ে গেছেভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, কাউন্টার কর্মীদের সঙ্গে যোগসাজশে কালোবাজারিচক্র আগে ভাগেই বিপুল সংখ্যক টিকিট অগ্রিম কিনে নেয়ায় এই সংকট হয়েছে
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সূত্রে বলা হয়, অগ্রিম টিকিট বিক্রির ব্যাপারে অ্যাসোসিয়েশনের কিছু করার নেইপরিবহন মালিকরা যেভাবে খুশি সেভাবেই টিকিট বিক্রি করছেনএখন টিকিট না থাকলে আমাদের কিছু করার নেই
লঞ্চ মালিকরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় কেবিনের সংখ্যা খুবই অপ্রতুলসে কারণেই টিকিট নিয়ে এমন হাহাকারঅন্যদিকে বেসরকারি বাস মালিকরা বলছেন, ১৫ রমযানের আগে থেকেই তারা দূরপাল্লার বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছেনসে কারণে ইতোমধ্যে অধিকাংশ রুটের টিকিট শেষ হয়ে গেছে
রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন বাসের কাউন্টারে অগ্রিম টিকিট নেয়া মানুষের উপচেপড়া ভিড় শুরু হয়েছে মঙ্গলবার থেকেআপনজনের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়িফেরা নিশ্চিত করতে রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করেছেন অনেকেইঅল্প কিছু মানুষ টিকিট পেলেও বেশিরভাগ মানুষই খালি হাতে ফিরছেনমহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদ বাসটার্মিনালসহ মতিঝিল, ফকিরাপুল, মালিবাগ, কল্যাণপুর, পান্থপথসহ বিভিন্ন এলাকার বাস কাউন্টারে টিকিট বিক্রি শুরু হয়অল্পসংখ্যক ভাগ্যবান টিকিট পেয়েছেনপ্রতিটি কাউন্টারেই টিকিট কিনতে যাওয়া মানুষ টিকিট না পেয়ে চরম ােভে ফেটে পড়েন
 টিকিটের জন্য শত শত মানুষের ভিড় ছিল প্রতিটি দূরপাল্লার পরিবহনের কাউন্টারে; কিন্তু ঈদে বাড়িতে যাওয়ার কাক্সিত টিকিট পেয়েছেন এমন লোকের সংখ্যা ছিল নিতান্তই হাতেগোনা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে কেউ কেউ টিকিট সংগ্রহ করতে পারলেও অনেক বেশি দাম দিতে হয়েছে২৮ আগস্ট চুয়াডাঙ্গা যাওয়ার জন্য ৪৫০ টাকা দিয়ে ডিলাক্স পরিবহনের টিকিট সংগ্রহ করেছেন শফিক নামের এক ছাত্রতিনি জানান, সারাবছর ভাড়া থাকে ৩০০ টাকা করে; কিন্তু এখন ঈদ উপলে ১৫০ টাকা বেশি দিতে হয়েছেতবে বেশি টাকা দিতে চেয়েও টিকিটের দেখা পাননি গাবতলীতে ভিড় করা বেশিরভাগ মানুষএক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ধরনা দিয়েও কোনো লাভ হয়নিদীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরির পর ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছেন তারামেহেরপুর, নওগাঁ, রাজশাহী, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, কুষ্টিয়া, রংপুর, জয়পুরহাট, বগুড়া, লালমনিরহাট, পাবনাসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২০টি রুটের টিকিট দেয়া হচ্ছে শ্যামলীর কল্যাণপুর ও সোহরাব ফিলিং স্টেশন কাউন্টার থেকে
কল্যাণপুরের শ্যামলী কাউন্টার থেকে রংপুরের টিকিট পাওয়া হাসান জানান, ভোর ৩টার সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ৯টার সময় ২৮ তারিখের দুটো টিকিট পেয়েছি২৯ তারিখের টিকিট দরকার ছিলআমার আগে মাত্র ৪০ জনকে টিকিট দেয়া হয়েছেএর মধ্যেই ২৯ তারিখের টিকিট কিভাবে শেষ হলোকল্যাণপুরের এসআর ট্রাভেলসেও ছিল বগুড়া, সান্তাহার, নওগাঁ, রংপুর, লালমনিরহাট, গাইবান্ধার টিকিট নিতে আসা মানুষের উপচেপড়া ভিড়রাজধানীর শ্যামলীতে এসপি গোল্ডেন লাইন, একে ট্রাভেলস, সাতীরা এক্সপ্রেস, কে লাইনের কাউন্টারগুলোতে দণিবঙ্গের যাত্রীরা অগ্রিম টিকিটের জন্য রাত ৩টা থেকেই লাইনে দাঁড়ানো শুরু করেতবে এখানে সাড়ে ৮টার মধ্যেই ২৯ ও ৩০ তারিখের টিকিট শেষ হয়ে যায়
যশোর যাওয়ার জন্য টিকিট নিতে আসা একজন এনজিও কর্মকর্তা জানান, সাড়ে সাতটার দিকে টিকিট বিক্রি শুরুর প্রায় ১ ঘণ্টার মধ্যেই ২৯ ও ৩০ তারিখের টিকিট শেষ হয়ে যায়এখন অন্য দিনের টিকিগুলো শুধু পাওয়া যাচ্ছেএদিকে দণিাঞ্চলগামী লঞ্চের অগ্রিম টিকিট বিক্রি ১৬ আগস্টের আগেই শেষ হয়েছে সব লঞ্চের ২৫ থেকে ৩০ আগস্টের টিকিটতবে এ টিকিট বিক্রি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে লঞ্চের মালিকদের পরামর্শেইতবে এেেত্র স্থানীয় সংসদ সদস্য, মালিক সমিতি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসকসহ বেশকিছু ক্যাটাগড়িতে টিকিট সংরণ করা হচ্ছেএ কারণেই প্রয়োজনীয় সময়ে টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না বা টিকিট সংগ্রহ করতে পারছেন না সাাধারণ যাত্রীরালঞ্চ মালিকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক না থাকলে টিকিট পাওয়া সম্ভব নয় বলে লঞ্চের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছেমালিক সমিতির সচিব মো. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ঈদের সময়ে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ হাজার কেবিনের চাহিদা থাকলেও রয়েছে ১৮শথেকে ২ হাজার কেবিন; কিন্তু এ টিকিট কাটা শুরু হয় প্রায় এক মাস আগ থেকেই

04.
সড়ক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার দায় শুধু যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নয়, সরকারেরও : নাগরিক সমাজ

১৯ আগস্ট (রেডিও তেহরান) : সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা ও মহা সড়কগুলোর বেহাল দশার জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতাকে দায়ী করে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ বা অপসারণের দাবি উঠেছে রাজপথ থেকে শুরু করে দেশের সংসদেতবে, নাগরিক সংগঠনের নেতারা বলছেন যে, যোগাযোগমন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দায়ী করে সার্বিকভাবে সরকারের ব্যর্থতাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে
দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে ঢাকা ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ মহাসড়কসহ সারা দেশের মহাসড়কগুলোর বেহাল দশায় গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয় পরিবহন মালিকরাকয়েকদিন ধরে বাস যোগাযোগ বন্ধ থাকার প্রেক্ষিতে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় সারা দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠেসড়ক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার জন্য যোগাযোগমন্ত্রীকে দায়ী করে তার পদত্যাগ দাবি করা হয়কিন্তু যোগাযোগমন্ত্রী এজন্য দায়ী করেন অর্থমন্ত্রীকেসংসদ অধিবেশনেও যোগাযোগমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেন সরকারী দলসহ মহাজোটের সংসদ সদস্যরা
যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও অর্থমন্ত্রণালয়ের এ দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে নাগরিক সমাজ মনে করে মহাসড়কের বেহাল দশার জন্য শুধু যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নয়, সার্বিকভাবে সরকারের অবহেলাই দায়ীনাগরিক সংগঠন সিটিজেনস রাইটস মুভমেন্টের মহাসচিব তুসার রেহমান রেডিও তেহরানকে বলেন, যখন একটি মন্ত্রণালয় ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় তখন সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া না হলে তার দায় পুরো মন্ত্রীপরিষদ বা সরকারের উপরই বর্তায়বর্তমান সরকারের বিগত আড়াই বছরে মহাসড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে এ সমস্যা মহীরুহে পরিণত হয়েছে তারপরও এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নেয়ায় তার দায় সরকার এড়াতে পারে নাএ অবস্থায়, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার জন্য বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রীকে সরিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহবানও জানান তুসার রেহমান
মহাসড়ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার বেশ কিছু কারণ তুলে ধরে নাগরিক সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই-এর প্রচার সম্পাদক গণি মিয়া বাবুল রেডিও তেহরানকে বলেন, মহাসড়কে অব্যবস্থাপনার জন্য এককভাবে যোগাযোগমন্ত্রণালয়কে দায়ী করা যথার্থ নয়কেননা মূল দায়িত্ব সরকারের, দেশের জনগণ এ বিষয়ে সরকারের কাছেই প্রত্যাশা করেতবে যোগাযোগমন্ত্রণালয় কোনভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না একই সাথে সড়ক অব্যবস্থাপনার জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বিআরটিএ, অর্থমন্ত্রণালয়সহ বেশ কিছু বিভাগকে দায় নিতে হবেযা সার্বিকভাবে সরকারেরই ব্যর্থতা বলে মনে করেন গণি মিয়া বাবুল
সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো ও ক্ষতিগ্রস্থদের পরিবারগুলোর সংগঠন সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ পরিবারবর্গ (ফুয়ারা)' আহবায়ক ইকরাম আহমেদ বলেন, সরকারের কাজ-কর্ম বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকেতাই যোগাযোগ ব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থা-ই দায়ীকিন্তু সার্বিকভাবে সরকারের পক্ষেও দায় এড়ানোর সুযোগ নেইকেননা দেশের জনগণ মনে করে, যেহেতু সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি সেহেতু এ সমস্যার জন্য সরকার-ই দায়ী সড়ক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানান ইকরাম আহমেদ
তারা সকলেই বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ না হওয়ার ফলেই মহাসড়কগুলোর এ বেহাল দশা তাই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়নে স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিতে হবে#