01.সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমরা যা করতে পারি
দেশে পরিবহন খাতে, বিশেষত সড়ক ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে, একধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। এই পরিস্থিতির অনিবার্য পরিণতি হিসেবে প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সরকারি হিসাবে দুর্ঘটনাজনিত প্রাণহানির সংখ্যা বছরে চার হাজারেরও বেশি। অন্যদিকে বেসরকারি হিসাবে তা ১২ হাজারের মতো। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই সংখ্যা প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। গত ১৩ আগস্ট একটি সড়ক দুর্ঘটনায় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রনির্মাতা তারেক মাসুদ, সাংবাদিক মিশুক মুনীর এবং তাঁদের তিনজন সহযোগী—জামাল, মোস্তাফিজ ও ওয়াসীমের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় গোটা দেশ কেবল স্তম্ভিতই হয়ে পড়েনি, এ ধরনের মৃত্যুর ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধেও সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। এর আগে গত ১১ জুলাই মিরসরাইয়ে ৪২ জন শিশু অকালে প্রাণ হারায় আরেক দুর্ঘটনায়, যা সারা দেশের মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। ২৮ জুলাই বগুড়ার শাজাহানপুরে ১৭ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। বছরের গোড়াতে কর্তব্যরত অবস্থায় দুজন কর্মকর্তাসহ ১০ জন পুলিশ নরসিংদীতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। এ বছরের জুলাই মাসে ১৭৩ ব্যক্তি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। একইভাবে নভেম্বর মাসে এক দুর্ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিজ্ঞান বিভাগের স্নাতকোত্তর পর্বের ছাত্রী নাদিয়া সুলতানাসহ চারজন মারা গেছেন। সফটওয়্যার প্রকৌশলী ও সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান টুগেদার ইনিশিয়েটিভ লিমিটেডের পরিচালক মনোয়ারুল হাসান এবং তাঁর স্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিত্সক নাহিদ রোকসানা প্রাণ হারিয়েছেন। দিনাজপুরে নিহত হয়েছেন তিনজন ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম, নভেদা বেগম ও জবেদা বেগম। এই তালিকা যে অনেক বড়, তা সবাই জানেন। এসব ঘটনার পাশাপাশি, বিশেষত ১৩ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনার অব্যবহিত পূর্বেই এ তথ্য সবাই জানতে পেরেছেন, নৌপরিবহনমন্ত্রীর সুপারিশে ২৪ হাজার লোককে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স প্রদানের চেষ্টা চলছে। অতীতে একই প্রক্রিয়ায় ১৪ হাজার ব্যক্তিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে বলেও জানা গেছে। ১৯৯০ সাল থেকে পরীক্ষা ছাড়া লাইসেন্স দেওয়ার এই প্রক্রিয়া চালু হয় এবং তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে কেবল চালকদের অদক্ষতাই যে একমাত্র কারণ নয়, তা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন আমরা দেশের পথঘাটগুলোর অবস্থা লক্ষ করি। ১৩ আগস্টের দুর্ঘটনার ঠিক আগে আগেই দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গিয়েছিল এবং বাস-ট্রাক মালিকেরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানবাহন চালাতে অস্বীকার করে। দেশের প্রধান প্রধান শহরের রাস্তাঘাটে গত এক দশকেও কোনো উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। তদুপরি দেশের প্রচলিত আইনগুলো ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাদি এতই দুর্বল যে এগুলো সময়োপযোগী নয়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলোও বাস্তবায়ন করা হয় না। পরিস্থিতির ভয়াবহতা কিছুটা সুস্পষ্ট হয় যখন দেখি মোটরযানের মালিকানার সংখ্যা অনুপাতে বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ হতাহতের ঘটনা বাংলাদেশে ঘটে (১০০০ মোটরযানের বিপরীতে ১০০ মৃত্যুর ঘটনা)। তা ছাড়া, এ দেশে ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম মূল কারণ হিসেবেও সড়ক দুর্ঘটনা আবির্ভূত হয়েছে। জাতীয় মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনার ৩৮ শতাংশ ঘটতে দেখা যাচ্ছে। আর অনুমান করা হয় যে বছরে গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ হাসপাতালগুলোর জরুরি বিভাগে চিকিত্সাসেবা নিতে বাধ্য হয়। সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক দিকটিও বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এক হিসাবে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনার অর্থনৈতিক মূল্য জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। এ ধরনের নানা বিষয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম ইতিমধ্যে সম্পাদিত হলেও সমাধানের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
পরিবহন খাতের এসব সমস্যার বিষয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া তথ্য ও জনগণের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার প্রেক্ষাপটে ১৩ আগস্টের পর নৌপরিবহনমন্ত্রী ও যোগাযোগমন্ত্রীর পদত্যাগ ও অপসারণের দাবি ওঠে সমাজের সর্বস্তর থেকে। তৃণমূল পর্যায় থেকে এ নিয়ে বিক্ষোভ, সমাবেশ, মিছিল সত্ত্বেও দুজন মন্ত্রী তা প্রত্যাখ্যান করেন। তদুপরি প্রধানমন্ত্রী সংসদ ও সংসদের বাইরে সুস্পষ্টভাবে মন্ত্রিসভার সদস্যদের ওপর তাঁর আস্থার কথা বলেন এবং মন্ত্রীদের পদত্যাগের দাবি নাকচ করে দেন। প্রধানমন্ত্রীর নাকচের আগে দেশের পরিবহন খাতের এই পরিস্থিতির জন্য অর্থ বরাদ্দ নিয়ে অর্থমন্ত্রী ও পরিবহনমন্ত্রী পরস্পরকে দোষারোপ করেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত এই খাতের বরাদ্দ ও ব্যয়ের হিসাব দাখিল করার জন্য সরকারকে নির্দেশ দেন।
গত কয়েক সপ্তাহের আলাপ-আলোচনা থেকে স্পষ্ট যে, দেশের সড়ক পরিবহনব্যবস্থা এখন এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়েছে, যাকে কেবল নৈরাজ্যকর বলাই যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের সড়কগুলো যে দীর্ঘদিন ধরে মৃত্যুফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়, তা এখন সবার কাছেই স্পষ্ট এবং তা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। যার সহজ অর্থ হচ্ছে যে, আমরা প্রতিদিনই দেশের অসংখ্য মানুষকে অসময়ে হারাচ্ছি; যাদের মধ্যে অনেকেই খ্যাতিমান, অনেকেই সম্ভাবনাময়। এই অবস্থা আর কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে সমাজের সর্বত্রই এখন এই অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি অবসানের দাবি উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের সচেতন সাধারণ মানুষের করণীয় কী? অনেকেই এই প্রশ্ন করছেন।
আমাদের ধারণা, সড়ক পরিবহন খাতের নৈরাজ্যের অবসান এবং প্রতিদিন সংঘটিত দুর্ঘটনা, যা সহজেই পরিহারযোগ্য, মোকাবিলার জন্য আমাদের করণীয় কাজকে আমরা তিনটি ভাগে ভাগ করতে পারি। এগুলো হচ্ছে: জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরি ও তার কাঠামো তৈরি; সমস্যা মোকাবিলায় স্থানীয়ভাবে মডেল তৈরি; এবং এই খাতের সংশ্লিষ্ট সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সমস্যার বিভিন্ন দিক সুনির্দিষ্ট করে জাতীয় পর্যায়ে নীতি ও কর্মপদ্ধতি তৈরি করা।
জবাবদিহির সংস্কৃতি ও কাঠামো
সড়ক পরিবহন খাতে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনা অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও দেশের সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনো রকম দায়িত্ব গ্রহণ করার কোনো মনোভাব প্রদর্শন করেনি। ১৩ আগস্টের পর সংশ্লিষ্ট দুজন মন্ত্রী যে কেবল পদত্যাগ করতেই অস্বীকার করেছেন তা নয়, তাঁরা এ জন্য কোনো রকম দায়িত্ব পর্যন্ত নেননি। যোগাযোগমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর মধ্যে প্রকাশ্য বিতর্কেও দেখা যায়, কেউই মনে করেন না যে অব্যাহত এই পরিস্থিতির জন্য সরকার ও কোনো সংস্থার দায়িত্ব রয়েছে। জবাবদিহির এই অভাব কেবল পরিবহন খাতেই রয়েছে তা নয়, সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যান্য ক্ষেত্রেও তা সমভাবে উপস্থিত। স্মরণ করা দরকার যে এটি কেবল বর্তমান সরকারেরই বৈশিষ্ট্য নয়। ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার পর আশা করা হয়েছিল, সরকার জনসাধারণের কাছে জবাবদিহির পরিচয় দেবেন। কোনো রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় যাওয়ার পর এ বিষয়ে কোনো রকম উত্সাহ দেখায়নি। পরিবহন খাত নিয়ে সারা দেশের মানুষের ক্ষোভের পটভূমিকায় প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য ও পদক্ষেপ জবাবদিহির অভাবকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এই বিষয়টি বোঝার জন্য জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন দলের একজন শীর্ষপর্যায়ের নেতার মন্তব্যই যথেষ্ট: ‘দায়িত্ব নেওয়ার জন্য এখন আর কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না’।
জবাবদিহি গণতন্ত্রের একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত এবং সাধারণ মানুষের ভোটাধিকারের মতোই একটি অধিকার। আর তাই সবার কর্তব্য হচ্ছে জবাবদিহির সংস্কৃতি তৈরির জন্য দাবি তোলা ও চাপ প্রয়োগ করা। এই লক্ষ্যে দরকার জবাবদিহির জন্য প্রতিষ্ঠান তৈরি এবং যেসব প্রতিষ্ঠান আছে সেগুলোকে শক্তিশালী করা। বাংলাদেশ সংবিধানের ৭৭ অনুচ্ছেদে যে ন্যায়পালের কথা বলা হয়েছে, তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন, দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করার দাবি হচ্ছে জবাবদিহির সংস্কৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। প্রত্যক্ষভাবে পরিবহন খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো, সংশ্লিষ্ট মালিক-শ্রমিক ইউনিয়ন, মন্ত্রণালয়, এসবের কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যত্যয় ঘটালে তার দায়িত্ব কার ওপর বর্তায়, তা সবারই জানার অধিকার রয়েছে। তার জন্য সাধারণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা দরকার এবং সরকারকে এসব বিষয়ে স্বচ্ছতা তৈরিতে বাধ্য করা দরকার।
স্থানীয়ভাবে সমস্যা মোকাবিলা করা
পরিবহন খাতের সমস্যা জাতীয় পর্যায়ের সমস্যা হলেও একে স্থানীয়ভাবে কী করে মোকাবিলা করা যায়, তা নিয়ে আমাদের ভাবা দরকার। সম্প্রতি বাগেরহাট জেলার রামপাল উপজেলায় আমাদের গ্রাম প্রকল্পের উদ্যোগে পরিবহন বিশৃঙ্খলা নিরসনে একটি স্থানীয় উদ্যোগ এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য। এলাকার জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতারা, পরিবহন সেক্টরের প্রতিনিধি, শিক্ষক, সাংবাদিক, এনজিওসহ সমাজের বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিদের এই উদ্যোগে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। সবচেয়ে বেশি এগিয়ে এসেছে পরিবহনশ্রমিক এবং এ খাতে বিনিয়োগকারীরাই। এদের বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য, সড়কের নৈরাজ্য এ খাতকে ক্রমাগত লোকসানের দিকেই ঠেলে দেয়। তাই এই অবস্থা তাদের কাম্য নয়। এ ছাড়া নেতিবাচক পরিস্থিতি নিম্ন আয়ের শ্রমিকদেরই ভোগায় বেশি। রামপালের উদ্যোগে তাই একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে, যেখানে উপজেলা চেয়ারম্যান, নির্বাহী কর্মকর্তা, অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষকমণ্ডলী, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, পরিবহনশ্রমিক-মালিক সবাই মিলে নিশ্চিত করবে যে নিজেদের এলাকায় কোনো দুর্ঘটনা ঘটবে না। এই ‘দুর্ঘটনামুক্ত উপজেলা’ গঠনের প্রতিশ্রুতি প্রতিটি এলাকার শান্তি ও নির্বিঘ্ন পথ চলাচলের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।
জাতীয় পর্যায়ে নীতি ও কর্মপদ্ধতি প্রণয়ন
আমরা এমন এক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনাগুলো জ্যমিতিক হারে বাড়তে দেখছি, যখন মাত্র কয়েক মাস আগে জাতিসংঘের নিরাপদ সড়কসংক্রান্ত কর্মসূচির (UN Decade of Action for Road Safety 2011-20) সঙ্গে বাংলাদেশ সরকার বেশ ঘটা করে একাত্মতা ঘোষণা করেছে। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর ওয়েবসাইটে সংরক্ষিত চমত্কার সব ডকুমেন্ট আর নিরীক্ষা-রিপোর্ট দেখলে যে কারও মনে হতে বাধ্য যে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আমাদের অগ্রগতি সন্তোষজনক। কিন্তু বাস্তবতা কতটা ভিন্ন, তা দেশের সাধারণ মানুষ ভালোই জানেন। আমরা মনে করি, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে যেসব সরকারি-বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে, তাদের মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। তা ছাড়া বুয়েট বা ব্র্যাকের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ যেসব গবেষণাকর্ম হচ্ছে, সে সম্পর্কেও নাগরিক সমাজ ভালোভাবে জানার সুযোগ পাচ্ছে না। এতে সরকারের প্রতি চাপ প্রয়োগ এবং দাবি আদায়ের কর্মকৌশল নিয়ে নাগরিক সমাজ ততটা কার্যকরভাবে উত্সাহী মনোভাব দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা এই অবস্থার একটি আশু সমাধান চাই। আমরা আরও মনে করি, প্রচলিত এবং জনপ্রিয় কর্মসূচির বাইরেও নাগরিক সমাজের নানা রকমের উদ্যোগ নেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে, যা টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে এগোতে পারবে এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করবে। এ ব্যাপারে আমরা একটি জাতীয় কনভেনশন আয়োজন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি, যেখানে স্বার্থসংশ্লিষ্ট সবাই অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে। এই কনভেনশনের কয়েকটি দিক নিয়ে আমাদের ভাবনাগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১। সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনার সিংহভাগই সরকারি কর্মকর্তা, বিশেষজ্ঞ ও গুটিকয়েক এনজিওর মধ্যে আমরা সীমিত থাকতে দেখেছি। আমরা মনে করি, এতে নিরাপদ সড়কসংক্রান্ত নানা উদ্যোগের সঙ্গে জনমানুষের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত হয় না। তাই প্রস্তাবিত জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে আমরা একটি জাতীয় ফোরাম গঠন করতে পারি, যেখানে বিভিন্ন ধাপে বুয়েটের কিছু বিভাগ এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের গবেষক, সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা/সচিব, ডাক্তার, পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের প্রতিনিধি, ঠিকাদার, সাংবাদিক, এনজিও কর্মী, মনোবিজ্ঞানী ও ভিকটিমদের পরিবারের প্রতিনিধিরা স্থান পাবেন।
২। জাতীয় কনভেনশনের মাধ্যমে সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচির সঙ্গে পরিচিত করানোর একটি সুযোগ থাকবে। একই সঙ্গে সরকারি ও বিরোধী দলের কাছে থেকে সড়ক নিরাপত্তাবিষয়ক রাজনৈতিক অঙ্গীকার আদায়ের বিষয়টিও থাকবে। এ ব্যাপারে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও জানানো হবে। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে আলাদা তহবিল গঠন, মহাসড়কগুলোর কাছাকাছি দুর্ঘটনার জন্য বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠাসহ নতুন ধরনের কিছু প্রস্তাব আমরা এই কনভেনশনের মাধ্যমে সরকারের কাছে পেশ করতে পারি। এই উদ্যোগে বেসরকারি সংস্থা ও ব্যবসায়ীদের জাতীয় সংগঠনকে অঙ্গীভূত করতে হবে।
৩। সড়ক নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্যোগের সফলতাগুলো কীভাবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কাজে লাগানো যায়, সে ব্যাপারে কর্মকৌশল প্রণয়ন। যেসব সংস্থা ও নাগরিক উদ্যোগ বিভিন্ন দেশে কাজ করছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন। তা ছাড়া, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভাগীয় পর্যায় থেকে শুরু করে কীভাবে থানা পর্যায়ে স্থানীয়ভাবে সড়ক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে নাগরিক সমাজ যুক্ত হতে পারে, তার দিকনির্দেশনা প্রণয়ন।
৪। সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে শিশু শিক্ষা কর্মসূচির একটি পরিকল্পনার কথা আমরা জানতে পেরেছি, যা উত্সাহব্যঞ্জক। তবে এ ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা ও উদ্যোগ (ইন্টারনেটে এ-সংক্রান্ত ডকুমেন্টগুলো বেশ সহজলভ্য) বিবেচনায় এনে নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজনীয়।
৫। বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে হলে প্রচলিত ক্যাম্পেইন কৌশলে পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, সড়ক ব্যবহারকারীদের সবারই অভ্যাস ও আচরণ পরিবর্তন করা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিষয়। কাজেই প্রস্তাবিত জাতীয় কনভেনশনে মনোবিজ্ঞানী এবং পাবলিক ক্যাম্পেইন বিশেষজ্ঞদের নতুন ধরনের প্রস্তাব দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
৬। নিরাপদ সড়ক নিয়ে গবেষণা ইনস্টিটিউট গঠনের প্রয়োজনীয়তা বিভিন্ন সময়ে বলা হয়েছে। আমরা মনে করি, এ খাতে গবেষণা ও উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। এ লক্ষ্যে বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে সাহায্য করা জরুরি। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পরিবহন খাতে যারা ব্যবসা করছে, তাদেরকে এই অর্থায়ন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হতে উত্সাহিত করা দরকার।
৭। প্রস্তাবিত জাতীয় কনভেনশনটির একাধিক দিক থাকতে পারে। এখানে গবেষণাভিত্তিক লেখালেখি থেকে শুরু করে প্রস্তাব/কর্মকৌশল সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে আহ্বান করা যেতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদেরও আমন্ত্রণ করা হবে, যাতে করে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার আদায় সম্ভব হয়। চূড়ান্তভাবে এই কনভেনশনের মাধ্যমে সরকার, এনজিও ও নাগরিক সমাজের এই পারস্পরিক যোগাযোগের সম্পর্ক তৈরি ও অব্যাহত রাখা এবং এর ওপর ভিত্তি করে নিরাপদ সড়ক নিয়ে নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার কাজে এগোতে হবে।
উল্লিখিত তিনটি করণীয় সামনে রেখে পরিবহন খাতের নৈরাজ্য অবসান এবং সবার জন্য নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার জন্য সব ধরনের প্রচেষ্টাকে একত্র করা জরুরি। এ বিষয়ে বোধ করি কারোরই সন্দেহ নেই যে বাংলাদেশে সড়ক অব্যবস্থাপনার সঙ্গে আর্থিক দুর্নীতি ও অসততা জড়িয়ে আছে। তাই অনেকেই নাগরিক সমাজের নানা উদ্যোগের সফলতার ব্যাপারে সন্দিহান থাকেন। তবে আমরা বিশ্বাস করি, এ ব্যাপারে নাগরিক সমাজের ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ ও ‘লেগে থাকবার’ কৌশল একসময় সামাজিক সচেতনতা তৈরি করবেই এবং অব্যবস্থাপনার বিষয়টি আমরা একসময় সবাই মিলেই কাটিয়ে উঠতে পারব। তৃণমূল পর্যায় থেকে, বিশেষ করে ‘ছাত্র-শিক্ষক-পেশাজীবী-জনতা’ ফোরাম থেকে যেসব দাবি উঠেছে, তার মধ্যে যেমন আশু দাবি রয়েছে তেমনি রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের আকাঙ্ক্ষা। সমস্যা সমাধানে জনসম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখতে তৃণমূলের স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সমর্থন অব্যাহত রাখা দরকার। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে যারা সক্রিয়, তাঁদের এই প্রচেষ্টায় অঙ্গীভূত করা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অন্যান্য সংস্থা, গোষ্ঠী ও ব্যক্তিদের যথাযথ অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো রকম দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করা যাবে না। দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করা, তার বাস্তবায়নের অনুকূল পরিবেশ তৈরি এবং তার জন্য অব্যাহত চাপ প্রয়োগের জন্যই সবাইকে একটি প্ল্যাটফর্মে শামিল করাতে আমাদের উদ্যোগ নেওয়া দরকার, যেন আমরা আমাদের ভবিষ্যত্ বংশধরদের বলতে পারি, আরেকটি মিরসরাইয়ের ঘটনা কখনোই ঘটবে না।
02.
মহাসড়ক সংস্কারে দুর্নীতি
সারাদেশের ভাঙ্গাচুরা-গর্তেভরা যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী
সড়ক-মহাসড়কগুলোর বিভিন্নস্থানে
তড়িঘড়ি সংস্কারের নামে কয়েক শ’ কোটি টাকা ব্যয় করে জোড়াতালি দেয়া হয়েছে। ইটের খোয়া আর বালি দিয়ে জোড়াতালির রাস্তা মাত্র দুই সপ্তাহ যেতে না যেতেই আবারো
ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে যানবাহনের চালক ও যাত্রী সাধারণের ভোগান্তির পরিত্রাণ মিলছে না। ঈদুল ফিতরের আগে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের
ক্ষতিগ্রস্ত স্থানগুলোতে
ফেলানো ইট, সুরকি ও বালি উঠে গিয়ে আবারো
ছোট-বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। মাত্র এক সপ্তাহের
মধ্যে অত্যন্ত জরুরিভিত্তিতে মেরামত করা রাস্তা আবার আগের বেহাল অবস্থায় ফিরে গেছে এবং আগের মতোই যানবাহন
চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি
হচ্ছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম
মহাসড়কের চৌদ্দগ্রাম
বাজারের কাছে প্রায় এক কিলোমিটার, ফেনীর মহিপালে এক
কিলোমিটার এবং মিরসরাই
উপজেলার প্রায় ৪০ কিলোমিটার অংশ ঈদের আগে ইট,
খোয়া
আর বালি দিয়ে ভরাট করা
হলেও বৃষ্টির পানিতে ধুয়েমুছে ছোট-বড় গর্ত এবং এবড়ো-থেবড়ো অবস্থা আবার বেরিয়ে পড়েছে। এই মহাসড়কে প্রতিদিন শত শত
যানবাহন মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে চলাচল
করছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়ার আশঙ্কা কেবল বেড়েই যাচ্ছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ
মহাসড়কের ত্রিশাল
বাসস্ট্যান্ড থেকে নওধার এলাকা পর্যন্ত দুই কিলোমিটার রাস্তা খোয়া আর বালি দিয়ে মেরামত করা
হলেও খোয়া উঠে গিয়ে সারা রাস্তায় ছড়িয়ে পড়েছে। ময়মনসিংহ থেকে গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস মোড় পর্যন্ত
ক্ষতিগ্রস্ত অংশে ঈদের আগে তাড়াহুড়া করে
সম্পন্ন করা মেরামত কাজ টিকছে না। এতে জনভোগান্তির পাশাপাশি যানবাহন চলাচলে ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে কোনাবাড়ি এলাকায় প্রায় এক
কিলোমিটার রাস্তা আবারো যানবাহন চলাচলের অনুযযোগী হয়ে পড়েছে। সারাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোর বেহালদশার প্রধান কারণই হচ্ছে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, অযোগ্যতা, অদক্ষতা ও
নাজিরবিহীন দুর্নীতি। সড়ক ও জনপথ
অধিদফতর
(সওজ) ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগে (এলজিইডি) দুর্নীতির উৎসব চলার কারণে সরকারের পরিকল্পনানুযায়ী
সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কার কাজ করা সম্ভব হয় না। গত শনিবার একটি দৈনিকে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, দরপত্র আহবান থেকে শুরু করে নির্মাণ কাজ
পর্যন্ত চলে অবাধ দুর্নীতি এবং
অধিকাংশ
ক্ষেত্রে যেনতেনভাবে নির্মাণ ও সংস্কার কাজ সম্পন্ন করা হলেও সওজের গুরুত্বপূর্ণ পদের কর্মকর্তাদের আর্থিক জৌলুস দিন দিন
বেড়েই চলেছে। বিনা টেন্ডারে
রাস্তা-মেরামতের কাজে ৬ কোটি ২০ লাখ টাকা,
রোড
কাটিং মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের
নামে ৩৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং ২৫ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণে ১৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা আত্মসাতের তথ্য সওজের বার্ষিক
অডিট রিপোর্টে পাওয়া গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ
মহাসড়কে এক ট্রাক বালি ফেলে ১২ ট্রাক বালির টাকা উঠিয়ে নেয়ার অভিযোগও আছে। দীর্ঘদিন ধরেই রাজধানী
ঢাকা মহানগরীর রাস্তাঘাট এবং সেইসাথে
সারাদেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক-মহাসড়কগুলোর সর্বোপরি প্রতিটি জেলা ও উপজেলার সড়কগুলোর
বেহালদশা নিয়ে দৈনিক সংগ্রামসহ সব পত্র-পত্রিকায় বিরামহীনভাবে লেখালেখি হলেও জনভোগান্তি নিরসনে সরকার ও তার
সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের যেন
কোনো দায়িত্ববোধ জাগ্রত হচ্ছে না। যানবাহন ও রোড ট্যাক্স বাবদ সরকার জনগণের কাছ থেকে যে অর্থ আদায় করে নেয় সে অর্থ
রাস্তা নির্মাণ ও সংস্কার কাজে
যথাযথভাবে ব্যয় করা হলে দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়। রাস্তাঘাট যান চলাচল উপযোগী থাকলে যানজটও কম হয়। খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয়
পণ্যসামগ্রী অল্প সময়ে সারাদেশে আনা-নেয়া করা যায়। জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়সীমার মধ্যে থাকে। আর
ব্যবসা-বাণিজ্যে থাকে চাঙ্গাভাব। সামগ্রিকভাবে
দেশের অর্থনীতির চাকা দ্রুত সামনের দিকে এগুতে থাকে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে,
যানবাহন
ও রাস্তা ব্যবহার বাবদ প্রদত্ত
ট্যাক্স ছাড়াও বিভিন্ন সড়ক উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য সরকারের বরাদ্দ অর্থের সদ্ব্যবহারের পরিবর্তে লুটপাটই চলে বেশি। গত অর্থবছরে সড়ক ও জনপথ উন্নয়নে ১০৩টি
প্রকল্পের বিপরীতে সরকারের বরাদ্দ এক হাজার ৭২৬ কোটি ৬ হাজার টাকা যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি বলে রাস্তঘাটের
অচলাবস্থার শিকার হতে হয়েছে দেশের
সাধারণ মানুষকে। ২০০৫-০৬ ও ২০০৬-০৭ অর্থ বছর পর্যন্ত সম্পন্ন অডিটে সড়ক ও জনপথ অধিদফতরে ২৫২ কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে
একশ্রেণীর অসাধু কর্মকর্তা বাড়ি-গাড়ি,
জমি-জমাসহ
অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও পাবলিক এ্যাকাউন্টস কমিটির তদন্ত অব্যাহত
রয়েছে বলে জানা গেছে। সারাদেশের
রাস্তাঘাটের চরম বেহালদশার কথা মাথায় রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কারের কাজ বন্ধ না রেখে সড়ক ও মাহসড়কগুলোতে নির্মাণ ও
মেরামতের নামে যাবতীয় অনিয়ম ও
দুর্নীতির তদন্ত কাজ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। পরবর্তীতে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী
কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করে সড়ক ও জনপথ অধিদফতর থেকে দুর্নীতি নির্মূলের পদক্ষেপ নিতে হবে।
দেশের
উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায়
রাখার লক্ষ্যে সড়ক-মহাসড়কগুলোর সারাবছরই যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাখার কোনো বিকল্প নেই। প্রায়শ বৃষ্টি-অতি বৃষ্টি, বন্যা ও অন্যান্য প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা,
সড়ক-মহাসড়কে
যানবাহনের প্রচন্ড চাপ, রাস্তা সংস্কারে অর্থছাড়ে
বিলম্বসহ অন্যান্য সমস্যা-সীমাবদ্ধতার কথা মাথায় রেখে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে রাস্তা সংস্কার কাজকে
সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। সংস্কার বা
মেরামতের পর এক দুই সপ্তাহ না যেতেই রাস্তঘাট আবার আগের বেহাল অবস্থায় ফিরে যাওয়া কোনো অবস্থাতেই মেনে নেয়া
যেতে পারে না। সারাদেশের
সড়ক-মহাসড়ক সংস্কারে অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণেই যদি এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, সে ক্ষেত্রে ব্যাপক তদন্ত সাপেক্ষে দুর্নীতির সাথে জড়িতদের
খুঁজে বের করে কঠোর শাস্তি দেয়া উচিত। দুর্নীতির মূলোউৎপাটন করতে না পরলে জনভোগান্তি নিরসনের কোনো আশাই করা
যায় না। অতএব, দেশ ও জাতির বৃহত্তর
স্বার্থে সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ ও সংস্কার কাজের সকল পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি চিরদিনের জন্য নির্মূল করতেই হবে।
03.
সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি অদতা অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ৭০ ভাগ মহাসড়ক যান চলাচলের অনুপযোগী
সরকারের ব্যর্থতা আর অব্যবস্থার কারণে এবার ঈদে
অনেকেরই বাড়ি ফেরা হবে না। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মহ্নাগরী ও শহরে চাকরি
ব্যবসা বা কাজের প্রয়োজনে স্বজন বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাসকারী মানুষ সারা বছর
প্রতীায় থাকেন ঈদের এই দিনটির জন্য। ইউরোপ আমেরিকার মতো উন্নত দেশের মানুষ
প্রতিবছর বড়দিনে লম্বা ছুটি পান। আমাদের দেশের হতভাগাদের কপালে ঈদ উৎসবের
মতো বড় আয়োজনেও ৩ দিনের বেশি ছুটি মেলে না। এবারের এ তিনদিনের ছুটিও অধিকাংশ মানুষের
কাটবে স্বজন বিচ্ছিন্ন হয়ে। কারণ শেখ হাসিনা এরশাদ মেননের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের সীমাহীন দুর্নীতি, অদতা অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ৭০ ভাগ মহাসড়ক যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সড়ক ও জনপদ সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার
সড়ক-মহাসড়কের মধ্যে অন্তত ১৫ হাজার কিলোমিটার রাস্তা সংস্কারের অভাবে
যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী। ৫০ পয়েন্টের অবস্থা চরম খারাপ। সড়ক ও জনপথ
অধিদফতরের অধীনে সারাদেশে সড়কের পরিমাণ ২১ হাজার ৫৭১ কিলোমিটার। এর মধ্যে জাতীয়
মহাসড়ক ৬ হাজার ৪৪৫ কিলোমিটার, আঞ্চলিক মহাসড়ক ৪ হাজার ১০৫ কিলোমিটার। জেলা সড়ক রয়েছে ১০ হাজার ৬০৬ কিলোমিটার। প্রতিবছর কি পরিমাণ
রাস্তা নষ্ট ও এই
রাস্তা মেরামতে কি পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন তা নির্ধারণ করে সওজের মহাসড়ক
উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা বিভাগ। এ বছর বর্ষা শুরুর আগে ১২ হাজার ৪২৮
কিলোমিটার তিগ্রস্ত রাস্তা মেরামতের জন্য খসড়া সুপারিশমালা তৈরি করে সওজ। এর মধ্যে ৮০০ কিলোমিটার রাস্তা পুরোপুরি যানবাহন চলাচলের
অনুপযোগী। ধারণা জরুরিভাবে ১৫ হাজার কিলোমিটার রাস্তা
এখনই সংস্কার করা দরকার। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, দেশে ৯টি জাতীয়
মহাসড়কের দূরত্ব তিন হাজার কিলোমিটার। দেশে ৩৫০ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক,
৫৩০ কিলোমিটার আঞ্চলিক মহাসড়ক, এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার জেলা সড়ক মারাত্মকভাবে তিগ্রস্ত।
পরিবহন মালিক সমিতির নেতৃবৃন্দ জানান,
অবস্থার পরিবর্তন
না হলে দেশের অন্তত ৪০ জেলার সাথে রাজধানীর যোগাযোগ রা করা সম্ভব হবে না। দেশের উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় বাস চলাচল শুরু হলেও রাস্তা নষ্ট থাকায় ৩০ ভাগ যানবাহন চলাচল করেছে মাত্র। যানজটের কারণে
ঢাকা থেকে ময়মনসিংহ ২ ঘণ্টার রাস্তা যেতে সময় লাগছে ৭-৮ ঘণ্টারও বেশি।
এদিকে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে
ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে অন্তত ৫০টি পয়েন্টে রাস্তার বেহাল চিত্র। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও কলকারখানার কারণে
সৃষ্টি হচ্ছে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার। ডুবছে রাস্তা। মহাসড়কের ১০ পয়েন্টে হাঁটুপানি। কোথাও কোথাও মহাসড়ক ধারণ করেছে
ডোবা ও খালের আকৃতি। ফলে দিন দিন বাড়ছে দুর্ঘটনা। রাস্তার মাঝে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে গাড়ি ফলে
সৃষ্টি হচ্ছে লম্বা যানজট।
এদিকে প্রকৌশলীরা বলছেন, দুই বছর অন্তর অন্তর রাস্তার ওপর লেয়ার
না দেয়ার কারণে মহাসড়কে মহাবিপর্যয় দেখা দিয়েছে।
গাড়ি চলাচলের কারণে বৃষ্টির পানিতে সৃষ্ট
ছোটখাটো ক্রুটি তাৎণিক সংস্কার না হওয়ায় তা বড় আকার ধারণ করেছে। কথায় আছে সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। ঢাকা-ময়মনসিংহ
মহাসড়কের ১২২ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে প্রায় ৯০ কিলোমিটার যান চলাচলের অনুপযোগী।
ঢাকা টাঙ্গাইল মহাসড়কের এলেঙ্গা-মির্জাপুর ও
মির্জাপুর-টাঙ্গাইল শহর পর্যন্ত প্রায় ১২০ কিলোমিটার সড়কে বড়
বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। টানা বর্ষণের কারণে গর্তে পানি জমে ডোবায় রূপ
নিয়েছে। এছাড়া
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের সলিমপুর থেকে বড় দারোগাহাট
পর্যন্ত প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তা খানাখন্দে ভরা। তবে যোগাযোগ
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, এই সড়কের ১৯২ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে
২১টি পয়েন্টের
অবস্থা যান চলাচলের অনুপযোগী। যশোর-খুলনা মহাসড়কের প্রায় ৬০ কিলোমিটারে অবস্থা
বেশি খারাপ। খানাখন্দ আর ছোট-বড় গর্তে পানি জমে দুর্ভোগ চরমে
উঠেছে যাত্রীসহ পরিবহন সংশ্লিষ্টদের। খুলনা-সাতীরা মহাসড়কের প্রায় দুই
কিলোমিটার পানিতে ডুবে গেছে। এই সড়কের প্রায় ৬০ কিলোমিটার পথ ব্যবহারের
অনুপযোগী। তালা-পাইকগাছা
সড়কের ১০ কিলোমিটার দু-তিন ফুট পানির নিচে। একটু বৃষ্টি হলেই ওই সড়ক দিয়ে এখন নৌকা
চলাচল করে।
সওজ ২০১০-১১ অর্থবছরে মহাসড়ক মেরামতের যে
হিসাব দিয়েছে তাতে বলা হয়েছে, সারাদেশে অন্তত ৭০০ কিলোমিটার সড়ক জরুরি ভিত্তিতে মেরামত
করা প্রয়োজন। কিন্তু সওজ এসব সড়ক মেরামত করেনি। এখন টানা বর্ষণের কারণে এই মহাসড়কগুলোর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে। এছাড়াও মেরামতের অভাবে প্রায় একই অবস্থা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও মির্জাপুর থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পর্যন্ত সড়ক, কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া
সড়ক, ঢাকা-রাজশাহী
মহাসড়কের বনপাড়া-হাটিকুমরুল অংশ ও যশোর-খুলনা মহাসড়ক। এছাড়াও সিরাজগঞ্জ, বরিশাল, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর, জয়পুরহাট, ফেণী, সীতাকুণ্ডসহ বিভিন্ন মহাসড়কের চিত্র
বেহাল।
টাকা খরচ হয়েছে কিন্তু কাজ হয়নি
সড়ক জনপথ ( সওজ) সূত্রে প্রকাশ, গত তিন অর্থ বছরে
সড়ক উন্নয়ন ও রণাবেণ কাজে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২০ হাজার ১৬৩ কোটি
টাকা। বরাদ্দকৃত অর্থের
মধ্যে খরচ হয়েছে ১৯ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। উল্লিখিত ৩ অর্থ বছরে তাদের বরাদ্দ ছিল ৭ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা। আর তাদের ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার
প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ১২ হাজার ৪৬৫ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। উন্নয়ন ও রাজস্ব খাত মিলে তাদের অর্থ
ফেরত যাওয়ার ঘটনা নেই বললেই চলে। এতো বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও বর্ষা
মৌসুমে দেশের বিভিন্ন মহাসড়ক নাজুক অবস্থায় পৌঁছার পর সড়ক সংস্কারের
দাবিতে কয়েকটি রুটে গত কয়েকদিন ধরে বাস ধর্মঘটের মতো ঘটনা ঘটে।
সওজ সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে উন্নয়ন ও রাজস্ব
মিলিয়ে তাদের ব্যয় হয়েছিল ১ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা। এই বছরে তাদের উন্নয়ন খাতে মোট বরাদ্দ
ছিল ১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা। আর উন্নয়ন ব্যয় ছিল ১ হাজার ২১৩ কোটি টাকা। পরের বছর অর্থাৎ ২০০৯-১০ অর্থ বছরে
দুই খাত মিলিয়ে ব্যয় হয় ২ হাজার ৫৭৬ কোটি টাকা। এ বছর উন্নয়ন খাতের ২
হাজার ৩০৮ কোটি টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা। আর ২০১০-১১ অর্থ বছরে দুই খাতে ব্যয়
দাঁড়ায় ২ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। এ বছরে উন্নয়ন বরাদ্দ ২ হাজার ৬৩ কোটি টাকার বিপরীতে ব্যয়
ছিল ১ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা। সূত্র জানান, রাজস্ব খাতে তাদের বরাদ্দ ও ব্যয়ে তেমন কোনো পার্থক্য নেই।
অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল
অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থ বছরে উন্নয়ন ও রাজস্ব
মিলিয়ে তাদের ব্যয় ছিল ৩ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। পরের বছর (২০০৯-১০ অর্থ বছরে) ব্যয় হয় ৪ হাজার ৪২৮
কোটি টাকা।
আর ২০১০-১১ অর্থ
বছরে তাদের ব্যয় ছিল ৪ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকা। সূত্র জানায়, উভয় বিভাগের এই হিসাবের মধ্যে
দাতা ও সরকার প্রদত্ত অর্থ রয়েছে। এ বিষয়ে তথ্য সংগহের সময় জানা যায়, সওজের ২১ হাজার
কিলোমিটার ও এলজিইডির ৮০ হাজার কিলোমিটার (পিচ ও ইটের রাস্তা
মিলিয়ে) পাকা সড়ক রয়েছে। সওজ এর আওতাধীন জাতীয় মহাসড়ক, আঞ্চলিক মহাসড়ক ও জেলা সদরের
সঙ্গে উপজেলা গ্রোথ সেন্টারের সংযোগকারী জেলা সড়কগুলোর (ফিডার
রোড) অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। সওজের দায়িত্বশীল সূত্র বলেছেন, রণাবেণ কাজে আমাদের যে চাহিদা সে অনুযায়ী
আমরা বরাদ্দ পাই না। সে কারণে অনেক সময় জরুরি মেরামত কাজেও হাত দেয়া যায় না। গত অর্থ বছরে অর্থমন্ত্রণালয়ের
অনুমোদন নিয়ে আমরা উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ দিয়ে রাজস্ব খাতের কাজ করেছি। তাছাড়া আরও দুইটি বিষয় আছে যা রণাবেণ
বরাদ্দের উপর চাপ সৃষ্টি করে। এর মধ্যে প্রথমটি হলো বকেয়া বিল। রণাবেণ বরাদ্দ ছাড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি বড় অংশ আগের বকেয়া বিল পরিশোধে চলে যায়। এরপর আছে অস্থায়ী কর্মচারী। এই অস্থায়ী
কর্মচারীদের বেতন-ভাতাদি যায় রণাবেণ তহবিল থেকে। সারাদেশ জুড়েই সড়ক বিভাগে
অস্থায়ী কর্মচারী আছে। কিন্তু তাদের মোট সংখ্যাটি কত সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া
যায়নি।
এলজিইডি’র তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রওশন কবীর জানিয়েছেন,
তাদের পাকা সড়ক
নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য ৮০ হাজার কিলোমিটার (পিচ ও ইটের রাস্তা মিলিয়ে)। এর বাইরে রয়েছে মাটির রাস্তা। তিনি উল্লেখ করেন উপজেলা রোড, ইউনিয়ন রোডের
প্রায় ৬০ শতাংশ পাকা হয়ে গেছে। সব মিলিয়ে আমাদের সড়ক নেটওয়ার্ক এখন যথেষ্ট ভালো অবস্থায় পৌঁছেছে। প্রয়োজন হলো নিয়মিত রণাবেণ করা। এলজিইডির অন্য একটি সূত্র জানান, চলতি বছর রাজস্ব খাতে অর্থ প্রদানে
সমস্যা থাকায় অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে আমাদের উন্নয়ন খাত থেকে ২ হাজার কোটি
টাকা নিয়ে কয়েকটি সড়ক জরুরি ভিত্তিতে রণাবেণ ও প্রশস্তকরণের জন্য পরামর্শ দেয়া
হয়েছে।
একটি সূত্র জানায়, বরাদ্দকৃত টাকা যথাযথভাবে খরচ না করে
লুটপাট হওয়ায়, নতুন নির্মিত সড়ক দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়া। অবশ্য প্রকৌশলীরা ভিন্নমত প্রকাশ করে বলেন, বহন মতার অতিরিক্ত পণ্য বোঝাই ট্রাকের কারণে সড়ক নেটওয়ার্ক সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশে সাধারণত সিঙ্গেল এক্সেলের ট্রাকই বেশি চলাচল করে। ইদানিং কিছু ডাবল বা মাল্টি এক্সেলের
ট্রাক আসছে। কিন্তু তা সংখ্যায় অতি নগণ্য। ডাবল বা মাল্টি এক্সেলের একটি ট্রাক
বিদ্যমান সড়ক ব্যবস্থাতেই একসঙ্গে অনেক বেশি পণ্য পরিবহন করতে পারে। এেেত্র পণ্যের ওজন অনেকটা স্থান জুড়ে ভাগ হয়ে যাওয়ায় সড়কের তির সম্ভাবনা কমে যায়। কিন্তু এ ধরনের ট্রাকের দাম অনেক বেশি হওয়ায় বোধগম্য কারণেই পরিবহন ব্যবসায়ীরা ৫ থেকে ৭ টনের সিঙ্গেল এক্সেল ট্রাকে অতিরিক্তি পণ্য বোঝাই করে নিজেদের মুনাফা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যায়। এ রকম একটি ট্রাক অনেক সময় ২১ টন পর্যন্ত পণ্য নিয়েও রাস্তায় চলাচল করে। এই অতিরিক্ত বোঝাই ট্রাকের ভার জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কগুলো কোনো রকমে সামলালেও জেলা বা উপজেলা সড়কগুলো তা সামলাতে পারে না সেজন্যই প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেলে ব্রিজ, কালভার্ট ভেঙে বা সড়ক ধসে গিয়ে ট্রাক আটকে থাকার দৃশ্য ইদানিং খুব স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
ঘরমুখো মানুষের বিড়ম্বনা
আসন্ন ঈদুল ফিতরে ঘরমুখো যাত্রীদের যাতায়াতের
সুবিধার্থে নেয়া কোনো পদপেই কাজে আসছে না। বাস ও লঞ্চের অগ্রিম টিকিট সংগ্রহ করতে
গিয়ে যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ঈদে ঘরমুখো মানুষদের পণবন্দি করে টিকিটের
কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে পরিবহন কোম্পানিগুলো। প্রতিবারের মতোই এবারো টিকিটের বেশি দাম নেয়ার অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। যাত্রীদের অভিযোগ, লঞ্চ ও বাস মালিকরা শেষ মুহূর্তে বেশি দামে বিক্রির
উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে টিকিট বিক্রি বন্ধ রেখেছেন।
দণি-পশ্চিমাঞ্চলগামী বাস সার্ভিসগুলোর
কাউন্টারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিকাংশ কাউন্টারেই ২৯ ও ৩০ আগস্টের টিকিট
বিক্রি হয়ে গেছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন, কাউন্টার কর্মীদের সঙ্গে যোগসাজশে কালোবাজারিচক্র
আগে ভাগেই বিপুল সংখ্যক টিকিট অগ্রিম কিনে নেয়ায় এই সংকট হয়েছে।
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সূত্রে
বলা হয়, অগ্রিম টিকিট বিক্রির ব্যাপারে অ্যাসোসিয়েশনের কিছু করার নেই। পরিবহন মালিকরা যেভাবে খুশি সেভাবেই টিকিট বিক্রি করছেন। এখন টিকিট না থাকলে আমাদের কিছু করার নেই।
লঞ্চ মালিকরা বলছেন, চাহিদার তুলনায় কেবিনের সংখ্যা খুবই
অপ্রতুল। সে কারণেই টিকিট নিয়ে এমন হাহাকার। অন্যদিকে বেসরকারি বাস মালিকরা বলছেন, ১৫ রমযানের আগে থেকেই তারা দূরপাল্লার বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু করেছেন। সে কারণে ইতোমধ্যে
অধিকাংশ রুটের টিকিট শেষ হয়ে গেছে।
রাজধানীজুড়ে বিভিন্ন বাসের কাউন্টারে অগ্রিম টিকিট
নেয়া মানুষের উপচেপড়া ভিড় শুরু হয়েছে মঙ্গলবার থেকে। আপনজনের সঙ্গে ঈদ করতে বাড়িফেরা নিশ্চিত
করতে রাত থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ করেছেন অনেকেই। অল্প কিছু মানুষ টিকিট পেলেও বেশিরভাগ মানুষই খালি হাতে ফিরছেন। মহাখালী, গাবতলী, সায়েদাবাদ বাসটার্মিনালসহ
মতিঝিল, ফকিরাপুল, মালিবাগ, কল্যাণপুর, পান্থপথসহ বিভিন্ন এলাকার বাস কাউন্টারে টিকিট বিক্রি শুরু
হয়। অল্পসংখ্যক
ভাগ্যবান টিকিট পেয়েছেন। প্রতিটি কাউন্টারেই টিকিট কিনতে যাওয়া মানুষ টিকিট না পেয়ে
চরম ােভে ফেটে পড়েন।
টিকিটের জন্য শত শত মানুষের ভিড় ছিল প্রতিটি
দূরপাল্লার পরিবহনের কাউন্টারে; কিন্তু ঈদে বাড়িতে যাওয়ার কাক্সিত
টিকিট পেয়েছেন এমন লোকের সংখ্যা ছিল নিতান্তই হাতেগোনা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা
দাঁড়িয়ে থেকে কেউ কেউ টিকিট সংগ্রহ করতে পারলেও অনেক বেশি দাম দিতে হয়েছে। ২৮ আগস্ট চুয়াডাঙ্গা যাওয়ার জন্য ৪৫০
টাকা দিয়ে ডিলাক্স পরিবহনের টিকিট সংগ্রহ করেছেন শফিক নামের এক ছাত্র। তিনি জানান, সারাবছর ভাড়া থাকে ৩০০
টাকা করে; কিন্তু এখন ঈদ উপলে ১৫০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। তবে বেশি টাকা দিতে
চেয়েও টিকিটের দেখা পাননি গাবতলীতে ভিড় করা বেশিরভাগ মানুষ। এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ধরনা
দিয়েও কোনো লাভ হয়নি। দীর্ঘ সময় ঘোরাঘুরির পর ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেছেন তারা। মেহেরপুর, নওগাঁ, রাজশাহী, দিনাজপুর, সৈয়দপুর, কুষ্টিয়া, রংপুর, জয়পুরহাট, বগুড়া, লালমনিরহাট, পাবনাসহ উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের
প্রায় ২০টি রুটের টিকিট দেয়া হচ্ছে শ্যামলীর কল্যাণপুর ও সোহরাব
ফিলিং স্টেশন কাউন্টার থেকে।
কল্যাণপুরের শ্যামলী কাউন্টার থেকে রংপুরের টিকিট
পাওয়া হাসান জানান, ভোর ৩টার সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ৯টার সময় ২৮ তারিখের দুটো টিকিট পেয়েছি। ২৯ তারিখের টিকিট দরকার ছিল। আমার আগে মাত্র ৪০ জনকে টিকিট দেয়া হয়েছে। এর মধ্যেই ২৯ তারিখের টিকিট কিভাবে শেষ হলো। কল্যাণপুরের এসআর ট্রাভেলসেও ছিল বগুড়া, সান্তাহার,
নওগাঁ, রংপুর, লালমনিরহাট,
গাইবান্ধার টিকিট
নিতে আসা মানুষের উপচেপড়া ভিড়। রাজধানীর শ্যামলীতে এসপি গোল্ডেন লাইন,
একে ট্রাভেলস,
সাতীরা এক্সপ্রেস, কে লাইনের কাউন্টারগুলোতে দণিবঙ্গের যাত্রীরা অগ্রিম টিকিটের জন্য রাত ৩টা থেকেই লাইনে দাঁড়ানো শুরু করে। তবে এখানে সাড়ে ৮টার মধ্যেই ২৯ ও ৩০ তারিখের টিকিট শেষ হয়ে যায়।
যশোর যাওয়ার জন্য টিকিট নিতে আসা একজন এনজিও
কর্মকর্তা জানান, সাড়ে সাতটার দিকে টিকিট বিক্রি শুরুর প্রায় ১ ঘণ্টার
মধ্যেই ২৯ ও ৩০ তারিখের টিকিট শেষ হয়ে যায়। এখন অন্য দিনের টিকিগুলো শুধু পাওয়া
যাচ্ছে। এদিকে
দণিাঞ্চলগামী লঞ্চের অগ্রিম টিকিট বিক্রি ১৬ আগস্টের আগেই শেষ হয়েছে সব
লঞ্চের ২৫ থেকে ৩০ আগস্টের টিকিট। তবে এ টিকিট বিক্রি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে লঞ্চের মালিকদের পরামর্শেই। তবে এেেত্র স্থানীয় সংসদ সদস্য, মালিক সমিতি, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা, জেলা প্রশাসকসহ
বেশকিছু ক্যাটাগড়িতে টিকিট সংরণ করা হচ্ছে। এ কারণেই প্রয়োজনীয় সময়ে টিকিট পাওয়া
যাচ্ছে না বা টিকিট সংগ্রহ করতে পারছেন না সাাধারণ যাত্রীরা। লঞ্চ মালিকদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক না থাকলে টিকিট পাওয়া সম্ভব নয় বলে লঞ্চের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে। মালিক সমিতির সচিব
মো. সিদ্দিকুর রহমান পাটোয়ারী বলেন, ঈদের সময়ে প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ হাজার কেবিনের চাহিদা
থাকলেও রয়েছে ১৮শ’ থেকে ২ হাজার কেবিন; কিন্তু এ টিকিট কাটা শুরু হয় প্রায় এক মাস আগ থেকেই।
|
সড়ক ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার দায় শুধু যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের নয়, সরকারেরও :
নাগরিক সমাজ
|
|
১৯ আগস্ট (রেডিও তেহরান) : সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনা ও মহা সড়কগুলোর বেহাল দশার জন্য যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতাকে দায়ী করে যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনের পদত্যাগ বা অপসারণের দাবি উঠেছে রাজপথ থেকে শুরু করে দেশের সংসদে। তবে, নাগরিক সংগঠনের নেতারা বলছেন যে, যোগাযোগমন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট
বিভাগকে দায়ী করে সার্বিকভাবে সরকারের ব্যর্থতাকে আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে মহাসড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে ঢাকা ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ মহাসড়কসহ সারা দেশের মহাসড়কগুলোর বেহাল দশায় গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয় পরিবহন মালিকরা। কয়েকদিন ধরে বাস যোগাযোগ বন্ধ থাকার প্রেক্ষিতে এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় সারা দেশে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সড়ক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার জন্য যোগাযোগমন্ত্রীকে দায়ী করে তার পদত্যাগ দাবি করা হয়। কিন্তু যোগাযোগমন্ত্রী এজন্য দায়ী করেন অর্থমন্ত্রীকে। সংসদ অধিবেশনেও যোগাযোগমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সমালোচনা করেন সরকারী দলসহ মহাজোটের সংসদ সদস্যরা। যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও অর্থমন্ত্রণালয়ের এ দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে নাগরিক সমাজ মনে করে মহাসড়কের বেহাল দশার জন্য শুধু যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নয়, সার্বিকভাবে সরকারের অবহেলাই দায়ী। নাগরিক সংগঠন সিটিজেনস রাইটস মুভমেন্টের মহাসচিব তুসার রেহমান রেডিও তেহরানকে বলেন, যখন একটি মন্ত্রণালয় ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দেয় তখন সে বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া না হলে তার দায় পুরো মন্ত্রীপরিষদ বা সরকারের উপরই বর্তায়। বর্তমান সরকারের বিগত আড়াই বছরে মহাসড়ক সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে এ সমস্যা মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তারপরও এ বিষয়ে ব্যবস্থা না নেয়ায় তার দায় সরকার এড়াতে পারে না। এ অবস্থায়, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার জন্য বর্তমান যোগাযোগমন্ত্রীকে সরিয়ে যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহবানও জানান তুসার রেহমান। মহাসড়ক নষ্ট হয়ে যাওয়ার বেশ কিছু কারণ তুলে ধরে নাগরিক সংগঠন নিরাপদ সড়ক চাই-এর প্রচার সম্পাদক গণি মিয়া বাবুল রেডিও তেহরানকে বলেন, মহাসড়কে অব্যবস্থাপনার জন্য এককভাবে যোগাযোগমন্ত্রণালয়কে দায়ী করা যথার্থ নয়। কেননা মূল দায়িত্ব সরকারের, দেশের জনগণ এ বিষয়ে সরকারের কাছেই প্রত্যাশা করে। তবে যোগাযোগমন্ত্রণালয় কোনভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না । একই সাথে সড়ক অব্যবস্থাপনার জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগ, বিআরটিএ, অর্থমন্ত্রণালয়সহ বেশ কিছু বিভাগকে দায় নিতে হবে। যা সার্বিকভাবে সরকারেরই ব্যর্থতা বলে মনে করেন গণি মিয়া বাবুল। সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানো ও ক্ষতিগ্রস্থদের পরিবারগুলোর সংগঠন সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ঐক্যবদ্ধ পরিবারবর্গ (ফুয়ারা)'র আহবায়ক ইকরাম আহমেদ বলেন, সরকারের কাজ-কর্ম বিভিন্ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়ে থাকে। তাই যোগাযোগ ব্যবস্থায় অব্যবস্থাপনার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সংস্থা-ই দায়ী। কিন্তু সার্বিকভাবে সরকারের পক্ষেও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। কেননা দেশের জনগণ মনে করে, যেহেতু সড়ক ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হয়নি সেহেতু এ সমস্যার জন্য সরকার-ই দায়ী। সড়ক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা বিভাগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ারও দাবি জানান ইকরাম আহমেদ। তারা সকলেই বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ কাজ না হওয়ার ফলেই মহাসড়কগুলোর এ বেহাল দশা। তাই পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়নে স্বল্পমেয়াদী পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ নিতে হবে।# |
No comments:
Post a Comment